অরাজ
আর্টওয়ার্ক: পলিটিক্যাল প্রিজনার শিল্পী: মোরো সুত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

আইনের শাসন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ

  • সেলিম রেজা নিউটন

সম্পাদকীয় নোট: আগস্ট বিদ্রোহের এক যুগ। ২০০৭ সালে সেনাকর্তৃত্বের জরুরি শাসনকে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম হয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। যে অল্প  ক‘জন শিক্ষক সেই জরুরি শাসনকে ক্রিটিক্যালি  দেখতে পেরেছিলেন  সেলিম রেজা নিউটন তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ চলবে না’- এই উচ্চারণকে ধারণ করে প্ররতিবাদী মৌন মিছিল করার দায়ে তিনিসহ তাঁর সহকর্মিদের আটক করা হয়। জরুরি আইন ভঙ্গের দায়ে কারাদণ্ড দেয়া হয় তাঁদের। অতঃপর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে তাঁদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয় ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিন সরকার। কারামুক্তির পর ক্ষমতা-কর্তৃত্ব- রাষ্ট্র-সমাজ-কারাগার-বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি নিয়ে বিপুল পরিসরে রচনা শুরু করেন সেলিম রেজা নিউটন, যা এখনও চলমান। তাঁর অচেনা দাগ গ্রন্থের তৃতীয় দাগে জরুরি শাসন সংক্রান্ত রচনা সংকলিত হয়েছে। আগস্ট বিদ্রোহের যুগপুর্তিতে অরাজ ধারাবাহিতভাবে তা প্রকাশ করছে।

আর্টওয়ার্ক: ডিকটেটর জাজমেন্ট
শিল্পী: ভ্লাদিমির কাজানেভস্কি
সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

কানাকে হাইকোর্ট দেখানো

অন্ধকে হাইকোর্ট দেখানো এ-দেশের মানুষের মুখের বুলি হিসেবে পুরোনো। কতো অজস্র মানুষের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা এ-বুলির ভিতরে জমা আছে তা অনুভব করা সম্ভব। অন্ধকে হাইকোর্ট দেখানো কিন্তু আইনের শাসন প্রতিষ্ঠারই নামান্তর এবং বলা বাহুল্য নয়, আমাদের দেশে আইনের শাসন সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মহান বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী। তাঁরা বিতাড়িত হওয়ার পর থেকে ক্রমাগতভাবে এখানে আইনের শাসন ভেঙে পড়তে থাকে। অবশেষে নয়া ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহের অনুমোদনপুষ্ট আমলা-ব্যবসায়ী-সামরিক শাসকগোষ্ঠীর নেতৃত্বে বিগত ১লা জানুয়ারি ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে আমরা শুনে আসছি। শোনা কথা হলেও কথাটা সত্য। কোটিপতি থেকে শুরু করে নিঃস্ব ভিক্ষুক পর্যন্ত সারাদেশের লোক সেটা হাড়ে-হাড়ে টের পাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তো বটেই, শিক্ষকরাও বাদ যান নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কানা ছাত্র-শিক্ষকদের রীতিমতো হাইকোর্ট দেখিয়েছে এই সরকার। কিন্তু আমরা শিক্ষকেরা সরকারকে আক্ষরিক অর্থে হাইকোর্ট দেখানোর আগেই মানুষের দাবি এবং গণ-অনুভূতির কাছে নতি স্বীকার করে সরকার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাজাপ্রাপ্ত চার জন শিক্ষককে মুক্তি দিয়েছে। সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল দুই সপ্তাহের ভেতরে ঢাবি’র চার শিক্ষককেও মুক্তি দেওয়া হবে। ছাত্রদেরকেও মুক্তি দেওয়ার কথা ছিল। সরকার কথা রাখে নি। সময়ক্ষেপন করেছে। সরকারের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং শিক্ষক সমিতির নেতাদের ঠিক কোন কোন দিক থেকে আলোচনা চলছিল তার বিস্তারিত আমি জানি না। আলোচনা ভেঙেই বা গেল কেন তাও অজানা।

কিন্তু আমি যেটা জানি, সারাদেশের লোক এরই মধ্যে বুঝে ফেলেছে, শিক্ষকদের বিরুদ্ধে আনা মারাত্মক অভিযোগগুলো স্রেফ বানানো কেচ্ছা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করে বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণের কোনো পরিকল্পনা কোনো মহলে আদৌ ছিল কি না এবং সেই প্রশ্ন আড়াল করার আগ্রহেই তাড়াহুড়া করে ঐসব কেচ্ছা প্রচার করা হয়েছিল কিনা তা এখনও কেউ অনুসন্ধান করেছেন কিনা জানি না। কিন্তু বাস্তবত, নৈতিক প্রশ্নে নিদারুণ লেজেগোবরে মাখামাখি করেই সরকার মুক্তি দিয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরকেও যে মুক্তি দিতেই হবে, সেটাও স্পষ্ট। শিক্ষকদের দিকে অতি-মনোযোগ দিতে গিয়ে ঢাবি-রাবি’র শিক্ষার্থীবৃন্দ এবং রাবি’র একজন ড্রাইভারের মুক্তির কথা সরকার যদি ভুলে যেতে চায়, তাহলে যে সমস্যা থেকেই যাবে, সে-কথা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নির্যাতনবিরোধী-কর্তৃত্ববিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ প্রতিদিনই মনে করিয়ে দিয়ে চলেছে।

তারপরও, মুক্তিদান আর মামলা চুকে যাওয়াতেই সব ফুরাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা রক্ষা এবং শিক্ষার্থীদেরকে নির্যাতন করার বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষকদের বিরুদ্ধে টাকা ঢেলে ছাত্র খেপানো এবং সহিংসতায় মদদ জোগানোর মতো অলীক-আশ্চর্য অভিযোগ আনা এবং তাদেরকে গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও কারাভোগ করানোর নজিরবিহীন ঘটনা ঘটানোটা রাষ্ট্র-
ব্যবসায়ীদের পক্ষে আদৌ সম্ভব হলো কীভাবে, সেটা তো আমাদেরকে বুঝতে হবে। সেজন্য বহুলনন্দিত আইনের শাসনের আসল অন্তঃসার, কর্তৃত্বপরায়ণ রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বাত্নক-স্বৈরতন্ত্রী হয়ে ওঠার প্রবণতা এবং রাষ্ট্রীয়-কর্পোরেট যৌথ প্রচারণা-প্রকৌশলের ঐক্য ও টানাপোড়েন, এক কথায় জরুরি জমানার জরুরি বাক্‌ধারাসমূহ (ডিসকোর্স) বুঝে দেখার প্রয়াস জরুরি।

আইনের শাসন কী বস্তু?

একেবারে প্রাথমিক অর্থে, আইনের শাসন মানে কিন্তু সবার জন্য ভালোভাবে খাওয়া
-পরার, যার যার পছন্দমতো জীবিকা ও সৃষ্টিশীল কাজের এবং প্রত্যেক মানুষের অফুরন্ত সম্ভাবনার বিকাশের জন্য মানানসই মানবিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাঠামো গড়ে তোলা নয়; আর সামাজিক পরিসরে সমস্ত মানুষের ব্যক্তিগত ও যৌথ আত্মকর্তৃত্বের আকার-আয়োজনের প্রশ্ন তোলা তো শাসক সমাজের আলোকিত-দীপায়িত লোকদের কাছে নিতান্তই অবান্তর।

আর্টওয়ার্ক: এগেন্স্ট টর্চার
শিল্পী: ইয়াসের আবু হামিদ
সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

আদতে আইনের শাসন কায়েম করা মানে হচ্ছে চির-মহান শাসকদের কথা শুনতে, তাঁদের নির্দেশিত পথে চলতে দেশের নাগরিকদেরকে বাধ্য করা এবং যাঁরা অবাধ্য হবেন তাঁদের ওপর বলপ্রয়োগ করার পাকাপোক্ত বন্দোবস্ত কায়েম করা। উদ্দেশ্য নিঃশর্তভাবে বিশ্বব্যাঙ্ক-আইএমএফের হুকুম মেনে চলার জন্য, তেল-গ্যাসের বহুজাতিক কর্পোরেশনসমূহ আর এন্টারটেইনমেন্ট- মিডিয়া- ও গ্ল্যামার-ইন্ডাস্ট্রির অবাধ লুণ্ঠন-বিচরণের ক্ষেত্র তথা বাজারের বিধিকে নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়ে গোলামির সংস্কৃতিকে প্রশ্নাতীতভাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য এবং বিশ্বজোড়া ইঙ্গ-মার্কিন আগ্রাসনের দালালি করার জন্য জনসাধারণকে বাধ্য করার আইনসম্মত পরিবেশ প্রস্তুত করা। অস্ট্রেলিয়া থেকে বন্ধু বখতিয়ারের (রাবি’র নৃবিজ্ঞানের শিক্ষক) ইমেইল মোতাবেক, উন্নত দেশের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নত বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় একে ‘নিও লিবারাল অ্যান্টিবায়োটিক’ও বলা যায়।

এই ওষুধের প্রধানতম কাজ হচ্ছে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ, সত্যিকারের ভিন্নমত আর স্বাধীন চিন্তার ভাইরাসগুলোকে নির্মূল করা। তো, এই কাজ পুরোনো জমানার ঘুষখোর গরীব পুলিশবাহিনী আর দূরদৃষ্টিহীন দেউলিয়া রাজনীতিবিদদের দিয়ে বাংলাদেশে হচ্ছিল না। তাই বিধিসম্মত রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের কার্যকর বন্দোবস্ত বানানোর জরুরি প্রয়োজন হাজির হয়। এই প্রয়োজনের স্বপক্ষের প্রচার-প্রচারণা চলেছে গত দেড় যুগ ধরে, তথাকথিত সুশীল সমাজের বুদ্ধিজীবীবৃন্দ ও মিডিয়ার নিবিড় নিরলস সাহসী ও সৃষ্টিশীল পরিশ্রমের মাধ্যমে। ফলে সামন্তযুগের ভুতের ঘাড়ে চড়ে ঘুরে-বেড়ানো গণবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর দেউলিয়াত্বের চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের উপযুক্ত উপলক্ষ পাওয়া মাত্র আইন এবং রাষ্ট্র-কর্তৃত্ব নবশক্তিতে বলীয়ান হয়ে সর্বাত্মক স্বৈরাচারী একটা চেহারা নিতে শুরু করে। তার বলপ্রয়োগের সংস্থাগুলো আরও নিখুঁতভাবে নিপীড়ক হয়ে উঠতে থাকে। এই প্রক্রিয়াটিই জরুরি আইন নাম ধারণ করে ১১ই জানুয়ারি ২০০৭ তারিখে সিংহাসনে আরোহন করে। বলে রাখা দরকার, ইতিহাসে দেখা গেছে, রাজশক্তিসমূহের বা শাসকগোষ্ঠীসমূহের বোঝাপড়া ভেঙে যাওয়া জনিত প্রতিটা মাৎস্যন্যায়ের পরই রাষ্ট্রের জুলুম-যন্ত্র তথা ‘জয়ী’ শাসকগোষ্ঠী আগের চাইতে বেশি কঠোর ও নিপীড়ক হয়ে ওঠার সুযোগ পায়।

আইনের বলপ্রয়োগ মানে প্রধানত আদালত রিম্যান্ড জেলজুলুম ক্রসফায়ার এনকাউন্টার এবং প্রকাশ্য দিবালোকে বা আধা-প্রকাশ্য রাত্রিলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে তথা যথোপযুক্ত লোকজনকে পুলিশ বা সামরিক-আধাসামরিক বাহিনী দিয়ে লাঠিপেটা করানো। একই সাথে ‘মানুষকে প্রত্যাশিত সেবাদান হবে পুলিশের কর্মকাণ্ডের ভিত্তি’ (৮ই জানুয়ারির ২০০৮ তারিখে পুলিশ-সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য) জাতীয় বক্তৃতা করাটাও আইনের সুশীল বাচনভঙ্গিরই আনুষ্ঠানিক অঙ্গ বটে। সরকারি বন্দুকধারী লোকজনের, মানে র‌্যাব-পুলিশ প্রভৃতি সংস্থার, বন্দুকের সেবাদান যে কতোটা নির্মম ও ভয়ঙ্কর হতে পারে, ভুক্তভোগী না হওয়া পর্যন্ত শাসক-পরিবারের সদস্যরা তা বুঝতে পারার মতো অনুভূতিশক্তির অধিকারী এখনও আছেন কি? নিপীড়ক রাষ্ট্রের পক্ষে বাম হাতে বন্দুক নিয়ে ডান হাতে সেবা দিতে যাওয়াটা যে নিতান্তই নির্মম ক্যারিকেচার, সেটা বুঝা কি খুবই কঠিন? নিরস্ত্র জনগণের সামনে ভয়ঙ্কর সব মারণাস্ত্রের অধিকারী একদল সংগঠিত মানুষ এসে যদি বলে, আমরা তোমাদেরকে উদ্ধার করতে এসেছি, অভিজ্ঞতাটা তাহলে সুখকর হয় না।

দেশী-বিদেশী ইতিহাস তা-ই বলে। বাস্তবে, বহুজাতিক কর্পোরেশনসমূহ আর ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে বলপ্রয়োগের নানান সব বন্দোবস্ত সাবলীল খরচ চালু করতে পারলে আপনি কার্যকর রাষ্ট্র, আর আপনার সরকার সুশাসনের সরকার, না পারলে আপনি ব্যর্থ রাষ্ট্র। আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামাত-জাপার ক্যাডাররা মানুষ খুন করার বন্দোবস্ত গড়ে তুললে সেটা দুর্বৃত্তের শাসন, আর পুলিশ-র‌্যাব-কোবরা-চিতার রাষ্ট্রীয় ‘ক্যাডার’দের মাধ্যমে বিনাবিচারে খুনের বন্দোবস্ত গড়ে তোলা হলে, সেটা আইনের শাসন।

আইনের শাসনের মূর্তিমান সীমাবদ্ধতা

কিন্তু আইনের জোরে, জেলজুলুম-বন্দুকের জোরে ‘অপরাধ’ দমন করা যায় না। যে দুর্নীতির কথা বলে জরুরি আইন জারি করা হয়েছে, জেল-জুলুম-হুকুমদারির সমস্ত হাতিয়ার ব্যবহার করেও সেই দুর্নীতিকে বাগে আনা যায় নি। দুর্নীতির প্রশ্নে সরকার প্রশ্নাতীত সুনীতির পরিচয়ও রাখতে পারে নি। অপছন্দের দুর্নীতিবাজকে ধরা হয়েছে, পছন্দের দুর্নীতিবাজকে বাইরে রাখা হয়েছে। উপদেষ্টাদের নিজেদেরই সম্পত্তির হিসাব দেওয়ার প্রশ্নটিকে লুকিয়ে ফেলা হয়েছে। দুর্নীতিবাজদের তালিকা কাটাছাঁটা করতে হয়েছে, কাউকে-কাউকে ছেড়ে দিতে হয়েছে, ব্যবসায়ীদের মধ্য থেকে আর কাউকে ধরা হবে না বলে কথা দিতে হয়েছে … একেবারে নাকানিচুবানি অবস্থা। বলপ্রয়োগের বাড়াবাড়িতে উল্টা বাজার-হাট দোকানপাট আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা-বাণিজ্য রাজনীতি-প্রতিষ্ঠান ছারখার হয়ে গেছে।

বোঝা গেছে, সমাজব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া দুর্নীতি দূর করা সম্ভব না। যে গণতন্ত্রহীনতার কথা বলে জরুরি আইনের সরকার বসানো হয়েছে, সে সরকারই গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে চলে নি; পাঁচ উপদেষ্টার পদত্যাগের কোনো ব্যাখ্যা সরকার দেয় নি; যে সেনাসদস্যটি ঢাবি-শিক্ষার্থীটিকে প্রহার করেছিল, তার কী বিচার হলো, জানা যায় নি; সেনা হেফাজতে নিহত মধুপুরের আদিবাসী নেতা চলেশ রিছিলের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার খবর মিডিয়ায় ছাপানো যায় নি; আরও কতো নিরাপরাধ মানুষ হয়রানি ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে, তার কোনো হদিস নেই; স্বচ্ছতার ব্যাপক অভাব থেকে গেছে; প্রধান উপদেষ্টা ও সেনাপ্রধানের দ্বৈত ক্ষমতাকেন্দ্র কখনও কখনও দৃশ্যমানভাবে সমান্তরাল হয়ে উঠেছে; প্রশ্নও উঠেছে, সদুত্তর মেলে নি। পুরোনো যুগের হাসিনা খালেদার মতোই প্রধান উপদেষ্টা দেদারসে ফিতা কেটেছেন, এটা-সেটা উদ্বোধন করেছেন, ক্যামেরা-ত্রাণ চালিয়েছেন। একই কাজ সেনাপ্রধানও চালিয়ে গেছেন, যাচ্ছেন সমানে। টিভি চ্যানেলগুলোকে দিয়ে উন্নতিমূলক প্রচারণা-ভিডিও চালানোও বাদ যায় নি। এ-রকম আরও অনেক দৃশ্য-কাঠামো সেই পুরোনো জমানার ছাঁচকে মনে করিয়ে দিয়েছে।

মিডিয়া স্বাধীন থাকে নি। টেলিফোন অ্যাডভাইস, কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আরোপিত সেন্সরশিপ এবং স্বারোপিত সেন্সরশিপের ঘটনা ঘটেছে অনেক, সাংবাদিকদের আটক করা হয়েছে, আটক করে নির্যাতন করা হয়েছে, মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে, কার্ফুর মধ্যে সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র দেখে-দেখে পিটানো হয়েছে। শিক্ষকদেরকে গ্রেপ্তার করার খবর পর্যন্ত পত্রিকায় এসেছে দু-আড়াইদিন পর, শিক্ষকদের মুক্তি দাবি করে মার্কিন সিনেটর এডোয়ার্ড কেনেডীর বিবৃতি ‘প্রথম আলো’য় ছাপা হয়েছে টিভিতে প্রচারেরও সপ্তাহখানেক পর। সেন্সরশিপ-যে হচ্ছে, মিডিয়া সে কথা ঠিকমতো প্রকাশ পর্যন্ত করতে পারে নি, কিংবা ইচ্ছা করে নি। ভয় যেমন ছিল, তেমনি এ-সরকারের সাথে মহাজনী মিডিয়ার স্বার্থ ও এজেন্ডার শ্রেণীগত ঐক্যও ছিল। ভিতরে-ভিতরে দেন-দরবার সত্ত্বেও সেই ঐক্যে বেশিরভাগ সময় কাজ হয় নি।

রাষ্ট্র, বলপ্রয়োগ, দীক্ষায়ন-প্রকৌশল

রাষ্ট্রশক্তি যখন সর্বাত্মক দমনমূলক চেহারা নিতে থাকে, তখন সে তার নিজ শ্রেণীর লোকদেরকেও শিকারে পরিণত করতে পারে। বহুলকথিত শ্রমিক শ্রেণীর রাষ্ট্র মানে যেমন প্রত্যেক শ্রমিকের রাষ্ট্র না, বিরলকথিত বুর্জোয়া রাষ্ট্র মানেও তেমনি প্রত্যেক বড়লোকের রাষ্ট্র না। কর্তৃত্বপরায়ণ আমলাতান্ত্রিক কাঠামোসমৃদ্ধ রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের খোদ পরিচালকবর্গ বা ম্যানেজার-গোষ্ঠী যে কোনো শ্রেণী-গোষ্ঠী-দল-ধর্ম-জাতির জন্য নিপীড়ক হয়ে উঠতে পারে। প্রসঙ্গত এটা এমন এক সত্য ইতিহাসে যার বহু প্রমাণ আছে, অথচ মার্কসবাদী-লেনিনবাদী, বুর্জোয়া উদারনীতিবাদী এবং অন্যান্য কর্তৃত্বপরায়ণ দলগোষ্ঠীগুলো তা উপলব্ধি করে বললেই চলে। এ জন্য, শুধু ভালো মানুষদেরকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিলেই রাষ্ট্র ভালো হয়ে যায় না, রাষ্ট্রের কর্তৃত্বপরায়ণ কাঠামোর একেবারে আমূল পরিবর্তন ছাড়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বির্মাণের সুদীর্ঘ প্রক্রিয়া সত্যিকারের গণমুখীনতা অর্জন করতে পারে না।

আর্টওয়ার্ক: স্ট্রং আর্ম
শিল্পী: ভ্লাদিমির কাজানোভস্কি
সূত্র কার্টুন মুভমেন্ট

জনগণের স্বাধীনতার পরিসর বাড়াতে গেলে, অনিবার্যভাবে তাই আসে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীভূত আমলাতান্ত্রিক শক্তিকে ক্রমশ দুর্বল করার প্রশ্ন এবং জনগণের সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সমাজ-সঙ্ঘ-শক্তিকে ক্রমাগতভাবে প্রসারিত করার এযাবৎ অনালোচিত প্রশ্ন। কেনো না, জরুরি হোক, আর শিথিল হোক, অল্পকিছু লোকের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হলেই স্বৈরতন্ত্রী জুলুমের আশঙ্কা দেখা দেয়। শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় কিনা বলা মুশকিল, কিন্তু সুন্দর নাম দিয়ে শাসন-পীড়নের বাস্তবতা ঢাকা যায় না। খেয়াল করা জরুরি যে, আইনের শাসন মানেও কিন্তু ঐ শাসনই। সুশাসকও শাসক, দুঃশাসকও শাসক।

বাংলা একাডেমীর ব্যবহারিক এবং সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান দুটিতে, শাসন মানে হলো ‘দমন’ ‘গ্রহ’ ‘অত্যাচার’ ‘তিরস্কার’ শাস্তিদান’ ‘ভর্ৎসনা’ ‘নির্দেশ’ ‘আজ্ঞা’ ‘বিধি’ ইত্যাদি। সুব্যবস্থার সাথে প্রতিপালন, বা ‘পরিচালনা’ জাতীয় দুই-একটা কথাও অভিধানে (এবং শাসকদের লোক-শোনানো বুলিতে) আছে বটে। কিন্তু কে না জানে, কোনো শাসকই বলে না যে, আমি তোমাদের দমন এবং অত্যাচার করার জন্য এসেছি, সুতরাং বাঁচতে চাইলে সুবোধ বালকের মতো একান্ত বাধ্যানুগত থাকতে হবে। (ঔপবেশিক ধাঁচের আবেদনপত্রগুলোর ‘ইতি আপনার একান্ত বাধ্যানুগত’ জাতীয় শব্দরাজি স্মরণ করে দেখুন।) সবাই বরঞ্চ সুব্যবস্থার সাথে প্রতিপালন, তথা সুশাসনের বুলিই শোনায়, কিন্তু বাস্তবে যা করে তার নাম শাসন।

আসলে হাজার বছরের নিরলস চেষ্টায় গানে কবিতায় শাস্ত্রে পীড়নে শাসনের ধারণাটিকে পরাজিত মানুষের অভ্যাসের মজ্জায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। ‘শাসন করা তারই সাজে আদর করে যে’, ‘পেটে খেলে পিঠে সয়’, ‘ভাত দেওয়ার ভাতার না, কিল মারার গোঁসাই’ এসব আদতে বস্তাপচা কিন্তু দাসত্ব-মনোবিকারগ্রস্তদের দ্বারা অভিনন্দিত প্রবাদ-প্রবচন শাসনের সুপ্রাচীন ধারণার অনুমোদন দেয়।

এক অর্থে, পাঁচ হাজার বছরের সভ্যতার ইতিহাস তো একদিকে কেন্দ্রীভূত শাসন-কর্তৃত্ব, অন্যদিকে গণদাসত্বের ইতিহাসও বটে। এ-ইতিহাস জুড়ে আপাত বিচারে কর্তৃত্বেরই জয়জয়কার হয়েছে। ফলে শাসকশ্রেণী দিবারাত্রি যখন আইনের শাসনের বুলি প্রচার করে, তখন খুব কম লোকেরই খটকা লাগে, সব প্রচারণাই মনে হয় স্বাভাবিক। ফলত পদ্মা নদী এবং তার পরিপার্শ্বস্থ নিসর্গে ঢাকা বিশাল জেলখানা দেখেও কারও খটকা লাগে না, মনে হয় যেন পদ্মা নদীর মতোই এটাও কোনো প্রাকৃতিক প্রতিষ্ঠান। এটা দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষণ তথা শাসক শ্রেণীর দীক্ষায়ণ-প্রকৌশলের পরিণাম।

জুলুম, প্রতিরোধ এবং বিদ্রোহ

কিন্তু মানুষের ইতিহাস আদতে প্রতিরোধের ইতিহাসও বটে। বোধগম্য কারণে সে-ইতিহাস খুব একটা রচিতও হয়, প্রচারিতও হয় নি। বাঙালীর ইতিহাস: আদিপর্ব গ্রন্থেও দেখবেন জেলজুলুম কয়েদ-কারাগার-নিপীড়ন নির্যাতন-পরাধীনতা ও সে-সবের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিরোধের ইতিহাস নিয়ে কোনো কথা নাই বললেই চলে, এ-বিষয়ে আলাদা একটা অধ্যায় থাকা তো নিছক কষ্ট-কল্পনা। তথাচ মানুষের নিরন্তর প্রতিরোধ জারি আছে। সেগুলোকে বিদ্রোহ নামে ডাকা হয় না, যেন সেগুলো ‘আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি’ মাত্র

আর্টওয়ার্ক: রাইট টু প্রটেস্ট
শিল্পী: ভ্লাদিমির খাখানভ
সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

গত এক বছরের জরুরি অবস্থায় দমবন্ধ-করা মহামান্য ভয়ের রাজত্বেও কৃষকেরা শ্রমিকেরা গার্মেন্টস-কর্মীরা ছাত্রেরা শিক্ষকেরা প্রতিরোধ-আন্দোলনের আগুনে স্বাধীনতার শিখা সমুন্নত রেখেছেন। মানুষের অন্তরাত্মা এই শিক্ষা কখনও ভোলেনি, মুখে যদিও সকলে রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার বুলিই আওড়ায়, তবু যে যায় লঙ্কায় সে-ই হয় রাবণ। মানুষের যৌথ-স্মৃতিতে রাবণ-রাক্ষসের রাজ-নীতি এখনও বহাল আছে। লেনিনের অনেক আগেকার রুশ বিপ্লবী বাকুনিনও ১৮৭০ সালে এই কথাই বলেছিলেন: সবচেয়ে র‌্যাডিক্যাল বিপ্লবীটিকে আনুন এবং তাকে নিখিল রাশিয়ার সিংহাসনে বসিয়ে দিন অথবা তাঁকে একনায়কের ক্ষমতা দিয়ে দিন এবং এক বছর পার হওয়ার আগেই তিনি খোদ জারের চেয়েও নিকৃষ্ট হয়ে পড়বেন। (নোম চমস্কি, ১৯৭০)। বলশেভিকদের ইতিহাস বাকুনিনকে অভ্রান্ত প্রমাণিত করেছে।

ব্যক্তিগতভাবে খুব ভালো মানুষ হওয়া সত্ত্বেও আপনি যদি মানুষকে সেই ‘শাসন’ই করতে চান, আপনার রাষ্ট্র-পরিচালন-কাঠামোটা যদি উচ্চ-নিচ ধারার কর্তৃত্ব-ক্রমতান্ত্রিক এবং আমলাতান্ত্রিকই হয় এবং রাষ্ট্রের ব্যাপক ক্ষমতা যদি অল্প কয়েকজনের হাতেই কেন্দ্রীভূত থাকে, তাহলে মানুষের দুর্ভোগ এড়ানোর উপায় থাকে না। এ-রকম ‘গণতন্ত্রের’ বুদ্ধি-ঠাসা মাথায় স্বৈরতন্ত্রীর শিঙ গজাবেই। মহামতি লেনিন বা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো শ্রেষ্ঠ নেতাকেও আমরা সাংঘাতিক স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে দেখেছি এবং সেটাই ছিল স্বাভাবিক।

আমাদের এই এক বছরের জরুরি জমানাতেও আমরা কখনও কখনও জারের ছায়া দেখতে পেয়েছি। লেনিনের ‘চেকা’, হিটলারের ‘গেস্টাপো’, শাহের ‘সাভাক’ বাহিনীর সুদূরবর্তী নিশানাও এখানে-সেখানে অগোচর থাকে নি। তদুপরি সে যুগ আর নাই। সেকালের গুপ্ত খুনের বদলে এখন এসেছে প্রকাশ্য রাষ্ট্রীয় খুনের যুগ। রাষ্ট্র এখন তার অপছন্দের নাগরিকদের চাইলে খুন করে, চাইলে হাতে-পায়ে নল ঠেকিয়ে গুলি করে পঙ্গু বানিয়ে পত্রিকায় খবর পাঠায়, টিভি-ক্যামেরা ডেকে পাঠায়। সম্ভাব্য প্রতিবাদীদের জন্যে, স্বাধীনতা মানবাত্মার জন্যে বার্তা ঘোষিত হয়: বুদ্ধিমানের জন্য বন্দুকের ইশারাই যথেষ্ট।

আর আমাদের ভাই-বন্ধুদেরকেই কিন্তু অপরাধী দমনের মতাদর্শ খাড়া করে রাষ্ট্রীয় নিধনযজ্ঞে নিয়োজিত করা হচ্ছে। আমাদের প্রাণপ্রিয় রাষ্ট্রটিই কিন্তু বিনাবিচারে মানুষ খুন করার মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার এবং অকল্পনীয় নির্যাতন-নিপীড়নের মাধ্যমে সত্য প্রতিষ্ঠা করার চাকুরিতে নিয়োগ করেছে আমাদেরই দেশের সৎ ও দেশপ্রেমিক অফিসারদেরকে। থানা মানে জুলুম-কেন্দ্র। র‌্যাবের অফিস মানে নির্যাতন-কেন্দ্র। সারা বাংলাদেশকে টর্চার-চেম্বার বানিয়ে ফেললে কি দেশটা স্বর্গ হয়ে যাবে?

এ-সাধারণ সত্য প্রশ্নটা তোলার মতো বুদ্ধিজীবীর দেখা মিলছে না। রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মতাদর্শ মিডিয়া এবং শিক্ষিত সমাজ গিলছেন এবং প্রচার করছেন। খোদ খুনের চেয়ে খুনের মতাদর্শ বেশি ভয়ঙ্কর। অত্যাচারের চেয়ে অত্যাচারের বৈধতা আরও বেশি বিপজ্জনক। বলপ্রয়োগ করে মানুষের মঙ্গল করা যায় না, সে-কথা কে না জানেন? মনুষ্যত্ব-বিনাশী জল্লাদের চাকুরি থেকে আমাদের ভাই বেরাদর সন্তান বান্ধবদেরকে অব্যাহতি দানের ব্যবস্থা করার প্রশ্ন তোলাটাও আমাদের বৃহত্তর পারিবারিক কর্তব্যই বটে।

আইনের শাসন ও কারাগার

নীতি-নির্ধারক যে ব্যক্তিবর্গ রাষ্ট্রকে জালিম বানিয়ে তোলেন, তাদের রক্তমাংসের মুখ আড়াল করার জন্য জারের শাসন বা ফুয়েরারের শাসন বলে অভিহিত না করে আজকের শাসকেরা নিজেদেরকে কর্মকাণ্ডকে বলে থাকেন আইনের শাসন। অব্যাহতিপ্রাপ্ত বড় বড় চোখওয়ালা এক উপদেষ্টার মতোন প্রতিদিন মানুষকে তাঁরা ধমকান আর বলতে থাকেন, ‘আইন তার নিজ গতিতে চলবে’। কিন্তু আইনের নিজের গতি মানে-যে কর্তা-শাসকদের মতিগতি মাত্র, সে-কথা এ যুগের পাগল এবং শিশুদেরও না বুঝার কথা না।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষকদের নিষ্পাপ শিশু-সন্তানেরা কিন্তু প্রতি সপ্তাহে একদিন করে জেলে ঢুকেছে তাদের বন্দি পিতাদের দেখার জন্য। জেলখানা চিনে এসেছে পুষ্পসম লালন আর গার্গি। তারা ঠিক করেছে, বড় হয়ে তারা সকলকে বুঝিয়ে বলবে যে, সমাজে জেলখানার আসলে দরকার নেই। কেনো না, মানুষকে বন্দি করে রাখার মতো পাপ আর নেই। শাসকশ্রেণীর পাঁচ হাজার বছরের কর্তৃত্ববাদী সভ্যতার পাপের ফলে সৃষ্ট ক্ষতগুলো লুকানোর জন্যই বারো হাত তেরো হাত উঁচু ঐসব একটানা দেওয়াল রচনা করা হয়েছে। ঐসব দেওয়ালের নাম আইনের শাসন।

আর্টওয়ার্ক: কাইট
শিল্পী: নৌরি জাফরি
সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

সুতরাং ছাত্র-শিক্ষকদের মুক্তি দেওয়াটা অতীব দরকারি হলেও, তার চেয়েও জরুরি প্রশ্নটা হলো, অতীতের মতোই, বর্তমানে বা ভবিষ্যতে কখনও জরুরি কখনও ‘স্বাভাবিক’ আইনের স্টিম-রোলার যদি চলতেই থাকে, তাহলে কেউ না কেউ তার তলায় পিষ্ট হতেই থাকবে। এটাই কিন্তু নীতিগত বিচারে গোড়ার প্রশ্ন। মানুষকে বন্দি করে রাখার কোনো অধিকার আদৌ কি কোনো শাসক বা শাসনতন্ত্রের আছে?

জেলখানায় আমি অনেক নিরাপরাধ মানুষ দেখে এসেছি, কেউ কখনও যাদের মুক্তি দাবি করে পত্রিকায় লেখেনি, লিখবে না। অথচ তাঁরা আমাদের মুক্তির জন্য আন্তরিকভাবে উৎকণ্ঠিত থেকেছে, দোয়া করেছে। তাঁদের কী হবে? দমনমূলক রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ, কারাগার, আইনের শাসনের বিদ্যমান মৌলিক কর্মপ্রক্রিয়া ও নীতি-পদ্ধতিগুলোকে আমাদের বিদ্বৎসমাজ যদি এটা-ওটা অজুহাতে সঠিক বলে অনুমোদন করেন, তাহলে তাদেরকে এ-কথাও মানতে হবে যে, শিক্ষক-ছাত্রদের কয়েদ-খাটা ঠিকই আছে।

অসংখ্য নিরাপরাধ লোক (যাদের মধ্যে স্কুল-কলেজের শিক্ষকও আছেন) যদি দশ বিশ তিরিশ চল্লিশ বছর জেল খাটতে পারেন, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা পারবেন না কেনো? আর এ-বিদ্বৎসমাজ যদি মনে করে থাকেন, সমাজে বিশ্ব-বিদ্যালয়-শিক্ষক বা শিক্ষিত এলিট লোকদের মূল্য বেশি, তাহলে সেটা গণতান্ত্রিক সম-চেতনার করুণ কন্ট্রাডিকশনকে চিত্রায়িত করবে। আমাদেরকে তার মানে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে গেলে বিদ্যমান আইনের শাসনের খোদ প্রক্রিয়াটিকেই প্রশ্ন করতে হবে। জনগণের সৃজনশীল মনুষ্য-গুণাবলীর স্বাধীন বিকাশ ও আত্মকর্তৃত্বের সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলার কথা ভাবতে হবে।

বলপ্রয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়, গণতন্ত্র

বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবেক ও চিন্তা-প্রকাশের স্বাধীনতা যারা প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাঁরা কেমন করে বিস্মৃত হবেন যে, বৃহত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা যদি কাঠামোগত প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়ন থেকে মুক্ত না হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় নামক প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠবে না? লক্ষ-লক্ষ বছরের বিবর্তন-প্রক্রিয়া ও প্রকৃতির সাথে লেন-দেন থেকে অর্জন করা বিবেক, সহানুভূতি, সহযোগিতা, সংহতি, ভালোবাসা ও বিশ্বাসের পথে চলতে গেলে আপনাকেও হয়তো কারাগারে যেতে হবে। নিপীড়ক রাষ্ট্র-শাসকরা আপনাকে সহ্য করবে না।

তিয়াত্তরের অধ্যাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের স্বাধীনতার বেশ খানিকটা বিধান করেছিল। তবু শিক্ষকেরা স্বাধীন হন নি; একদিকে পদ প্রমোশন হালুয়া রুটির লোভে এবং অন্যদিকে রাষ্ট্র-রাজনীতির বলপ্রয়োগের ভয়ে। রাষ্ট্রের সুদীর্ঘ শুঁড় ঢুকে তছনছ করে দিয়েছে স্বায়ত্তশাসনের ধারণা ও অনুশীলন। আসলে আইন করে কাউকে স্বাধীন বানানো যায় না। বাজারে রূপান্তরিত হওয়া আজকের সমাজের প্রচুর মানুষ ঐ লোভ আর ভয়ের তাড়নাতেই স্বাধীনতা তথা মনুষ্যত্বকে একটু একটু করে হারিয়ে ফেলছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে-বাহিরে ভয় আর লোভের চোখে চোখ রেখেই আমাদেরকে স্বাধীন হয়ে উঠতে হবে। রাজনৈতিক দলীয় ও প্রাইভেট অস্ত্রধারী বাহিনী, রাষ্ট্রীয় রক্তচক্ষু এবং সরকারি বন্দুকধারীদের হুকুমকে চ্যালেঞ্জ করে বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষকেরা এবং বুদ্ধিজীবীরা যদি চিন্তা-বিবেক-প্রকাশের স্বাধীনতা ও মনুষ্যত্ব পাহারা দিয়ে রাখতে পারতেন, তাহলে আজ বিশ্ববিদ্যালয় ও সমাজের এ-হাল হতো না।

আর্টওয়ার্ক: দ্য পা্ওয়ার অব পাবলিক
শিল্পী: মেনেকসে কাম
শিল্পী: কার্টুন মুভমেন্ট

আমরা কি রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ, কারাগার এবং জুলুমের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ব্যতিরেকে একটা সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার আলোচনা শুরু করতে পারি না? কারাগারের পেট থেকে বের হয়ে আসার পর এ-কথা আমাদের ভুলে যাওয়ার উপায় নাই যে, বলপ্রয়োগের প্রতিষ্ঠান থাকলে কিন্তু কারও না কারও ওপর বলপ্রয়োগ করা হবেই। তাতে চলেশ রিছিলদের মৃত্যু হবে। কারাগার থাকলে কিছু লোককে সেখানে ঢোকানো হবেই। বলপ্রয়োগের কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্র ও কারাগার ব্যতিরেকেই কেবলমাত্র একটা রাষ্ট্র সত্যিকারের সুশীল রাষ্ট্র হতে পারে। বলপ্রয়োগ করে, গায়ের জোরে, লাঠির জোরে, বন্দুকের জোরে শুভ-মঙ্গল-কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা যায় না। মানুষকে বন্দি করে তার ‘অপরাধ’ সংশোধন করা যায় না, বন্দি করে মানুষকে স্রেফ নিঃস্ব ও ধ্বংসই করা যায়।

মানুষ তবু ধ্বংস হয় না। তার আত্মার ভেতরে আছে সৃষ্টিকর্তার আলো। জন্মসূত্রে মানুষ স্বাধীন। রুশো তাঁর ডিসকোর্স অন ইনইকুয়ালিটি (১৭৫৫) গ্রন্থে বলেছিলেন,

মানুষের মৌলিক ও নির্ধারক ধর্ম হচ্ছে তার স্বাধীনতা। দাসত্বের প্রতি স্বাভাবিক ঝোঁককে যাঁরা মানুষের ধর্ম বলে চালাতে চান, তাঁরা ভেবে দেখেন না যে, স্বাধীনতা এবং নিষ্পাপতা ও সৎকর্মের প্রতি স্বাভাবিক ঝোঁকও মানুষের ধর্ম। (উদ্ধৃত: নোম চমস্কি, ১৯৭০)

স্বাধীনতাই সৃজনশীলতার ধাত্রী। আর স্বাধীনতা আসে শুধু স্বাধীনতারই পথে। কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহই স্বাধীনতার সূচনা ঘটায়। দ্রোহ ও সংগ্রামের পথে আসে সংহতি। উৎপাদনের উপায়-উপকরণের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা এবং তার পাহারাদার সশস্ত্র কর্তৃত্বের হাজার-হাজার বছরের নিষ্পেষণে মানুষ তার হারিয়ে ফেলা বিবেক, সহানুভূতি, সহযোগিতা, সংহতি, ভালোবাসা, বিশ্বাস তথা মনুষ্যত্বকে মানুষ ফিরে পায় সংগ্রাম-সংহতি-স্বাধীনতার পথে।

প্রতিটা বিদ্রোহ আর সামাজিক আন্দোলন মানুষের মধ্যে শ্রেয়োচেতনা, উন্নত নীতিবোধ, হিতাকাঙ্ক্ষা আর সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের জন্ম দেয়। আমাদের বিশ্ব-বিদ্যালয়গুলোতে ২০০৭ সালের আগস্ট-বিদ্রোহ এই প্রশ্নগুলোকেই সামনে টেনে আনলে আমরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের পথে এগিয়ে যেতে পারব বলে আমার বিশ্বাস।

 

রাবি: ১২ই জানুয়ারি ২০০৮। প্রকাশ: ওঙ্কার,  ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা, ১৪ এপ্রিল ২০০৮
প্রবাসী বাঙালিদের অনলাইন পত্রিকা ইউকেবেঙ্গলি, লন্ডন, ২৫শে এপ্রিল ২০০৮

 

সেলিম রেজা নিউটন

সেলিম রেজা নিউটন

লেখক