অরাজ
আর্টওয়ার্ক: সেলফি অব ওয়ার শিল্পী: রিকার্ডো সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট
প্রচ্ছদ » ক্রসফায়ারের আইনি ভিত্তি

ক্রসফায়ারের আইনি ভিত্তি

  • সহুল আহমদ ও সারোয়ার তুষার

গত ২৬ জুন বরগুনায় দিনদুপুরে প্রকাশ্যে কয়েকজন সন্ত্রাসী রিফাত নামে এক লোককে কুপিয়ে হত্যা করে। হত্যাকাণ্ডের  ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্যে সবাই বেশ সরব হয়ে ওঠেন। পাচ-ছয়দিনের মাথায় সংবাদ এলো যে, রিফাত হত্যাকান্ডের মূল আসামী নয়ন বন্ড ক্রসফায়ারে (বা বন্দুকযুদ্ধে) নিহত হয়েছেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে ক্রসফায়ার প্রসঙ্গে আলাপ-আলোচনা আবারো শুরু হলো। উল্লেখ করা প্রয়োজন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শিরোনামে ২০১৮ সাল হতে ক্রসফায়ারের যে ভয়ঙ্কর তান্ডবলীলা শুরু হয়েছে এরপর থেকে, এমনকি নয়ন বন্ডের হত্যা পর্যন্তই বলা যায়, ক্রসফায়ার বিষয়ে অনেক আলাপ-আলোচনা চতুর্দিকে ঘুরপাক খাচ্ছে। বহুল প্রচলিত আলোচনাগুলোকে ধার করেই আমাদের এই আলোচনার সূত্রপাত।

আর্টওয়ার্ক: শুটিং
শিল্পী: অজ্ঞাত
সূত্র: পিনটারেস্ট

শুরুতেই একটা ডিসক্লেইমার দেয়া আবশ্যক।  ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার, বন্দুকযুদ্ধ এই শব্দগুলোকে পুরো লেখায় সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ক্রসফায়ার শব্দের সাথে ‘র‍্যাব’ নামক সশস্ত্র বাহিনীর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকলেও এখন পুলিশ থেকে শুরু করে বিজিবি কেউই ক্রসফায়ার-এনকাউন্টার-বন্দুকযুদ্ধে পিছিয়ে নেই। তাই, ক্রসফায়ার র‍্যাব কিংবা পুলিশ কিংবা রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়নমূলক যে প্রতিষ্ঠানই করুক; আমরা সবগুলোকে একই কাতারে বিবেচনা করব।

বলে রাখা ভালো, স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স আর ক্রসফায়ার-এনকাউন্টারের বয়স প্রায় সমান্তরাল। তবে, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের (২০০১-০৬) আমলে, নবপর্যায়ে ‘ক্রসফায়ার-এনকাউন্টার’ রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডের পরিভাষা হিসেবে আলাদা মনোযোগ পায়। সন্ত্রাস নির্মূল করার দোহাই দিয়ে র‍্যাব গঠন করা হয়েছিল ২০০৪ সালে। এই লেখা যখন লিখছি তখন ২০১৯ সাল, ক্ষমতায় আওয়ামী-মহাজোট সরকার। র‍্যাবের গঠনকালীন সময় ও বর্তমান সময় – এই দুই  আমলের কর্মকান্ডের প্রেক্ষিতে আমাদের বুদ্ধিজীবীতার অন্ধকার একটা দিক উন্মোচন করার মাধ্যমে এই লেখা শুরু করা যেতে পারে। র‍্যাব বা পুলিশ যখন ক্রসফায়ার করে তখন এর পক্ষে বেশ শক্তিশালী একটা মতামত তৈরি হয়। যেমন নয়ন বন্ডের হত্যার পর দেখা গেলো অনেকেই আপ্লুত হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিবিধ মন্তব্য করছেন। এই ক্রসফায়ারের পক্ষের মানুষ বা ‘খুশি হওয়া’ মানুষকে দুইভাগে ভাগ করা যায়। একভাগে আছেন গণসম্মতি উৎপাদনকারী, আরেকভাগে আছেন সেই উৎপাদনের ভোক্তারা। এই ভোক্তারা হচ্ছে রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিক, কখনো কখনো যাদের ‘আমজনতা’ বলেও সম্বোধন করা হয়। নাগরিকদের এই খুশি হওয়া আসলে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির একটা নিরুপায় প্রতিক্রিয়া। রাষ্ট্রীয় পরিসরে সহিংসতা – অপরাধপ্রবণতা যখন নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌছায়, যখন নাগরিক হিসেবে ব্যক্তি অসহায় হয়ে পড়ে, তখন সেই অসহায়ত্ব তাকে ক্রসফায়ারের সমর্থক করে তোলে। সে তখন কেবল সমর্থকই হয়ে ওঠে না ; বরং, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা স্বাভাবিকীরণে সচেতন-অসচেতন ভুমিকাও রাখে। পাশাপাশি এও বলা যায় যে তারা সম্মতি উৎপাদনকারীদের ভোক্তায় পরিণত হন। এই গণসম্মতি উৎপাদন করা যাদের কাজ তারাই হচ্ছেন বুদ্ধিজীবী, তাদের হাতে থাকে মিডিয়া, তাদের কলমের মুখে থাকে নানানরকম শব্দাবলী, ক্যামেরায় থাকে নানানরকম রঙ বেরঙের ছবি। তাদের সম্মতি-অসম্মতি উৎপাদন সময়ের সাথে সাথে বদলায়, ক্ষমতার সাথে লেনদেন এর হেরফের ঘটায়। তাদের সরব থাকা বা নিরব থাকা মোটেও কোনো নিরীহ বিষয় না ; বরং, পুরোদমে রাজনৈতিক। র‍্যাব যখন গঠন হয় তখন ২০৪ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক র‍্যাব গঠনকে স্বাগত জানান, ভিন্নভাবে বলতে গেলে তারা ক্রসফায়ারকেই ‘ন্যায্য’ বলে স্বীকৃতি দেন। সেই সময় আইন ও সালিশ কেন্দ্র ‘র‍্যাব’কে নিয়ে একটা সংখ্যা প্রকাশ করেছিল। অনেক বুদ্ধিজীবীই সেখানে জোরালোভাবে র‍্যাবের গঠন ও ক্রসফায়ারের বিরোধিতা করেছিলেন। এই ২০১৮ সালে ‘মাদকের  বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ স্লোগান দিয়ে যখন আবারো ক্রসফায়ারযজ্ঞ শুরু হলো তখন সেই বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই নীরব। বোঝাই যায়, ক্ষমতার পালাবদল তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থানের পালাবদল ঘটিয়েছে। অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন পত্রিকা ক্রসফায়ারের পক্ষে লেখা শুধু প্রকাশিতই করে নাই, বরং আরো অনেককিছুতে যে তারা ক্রসফায়ার চায় সেটাও উল্লেখ করিয়ে ছেড়েছে। রাষ্ট্রের দিক থেকে বিবেচনা করলে লাভের লাভ হলো, ক্রসফায়ারের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েও প্রশংসাপ্রাপ্তি ঘটল।  ক্রসফায়ারের পক্ষে এই মতামত তৈরি করার কিছু নমুনা ‘প্রোপাগাণ্ডা ও জনসংযোগের কৌশল’[১] প্রবন্ধে দেখানোর চেষ্টা করেছি। তাই, এখানে এই আলাপের বিস্তার ঘটাচ্ছি না।

যারা ক্রসফায়ারের বিরোধিতা করেন, তাদের অধিকাংশের কাছে ক্রসফায়ার খারাপ কারণ ক্রসফায়ার ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’। কারো কারো কাছে ‘রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড’। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মানে হলো কোনো বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে না গিয়েই হত্যা করা হয়েছে। এখানে দুই দিক হতে আলোচনা হতে পারে। ক্রসফায়ার কি আসলেই ‘বিচারবহির্ভূত’ হত্যাকাণ্ড? আমাদের সংবিধান, আমাদের রাষ্ট্রীয় বিধামালা কি এমন হত্যাকাণ্ডের পথ সুগম নাকি দুর্গম করে রেখেছে? আমাদের সংবিধান ও আইনে এর পাটাতন তৈরির প্রক্রিয়া বন্ধ করতে কি কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে ? নাকি এহেন হত্যাকাণ্ডের বীজ খোদ রাষ্ট্র পরিচালনার আইনেই উপস্থিত? এই প্রশ্নগুলো গুরত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে, কারণ সরষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ভূতের মতোই রাষ্ট্র পরিচালনার আইনেই ক্রসফায়ার-এনকাউন্টারের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ শর্ত হাজির থাকতে পারে। এতো গেলো রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দিক বিবেচনায় খুন-খারাবির বৈধতা-অবৈধতার প্রশ্ন, দ্বিতীয় যে প্রশ্ন না উঠে পারেইনা , তা হচ্ছে খোদ রাষ্ট্র-আইনের সমাজতাত্ত্বিক ও নৃবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ। রাষ্ট্রকে ‘সহিংসতার ঘনীভূত রূপ’ মনে করতেন গান্ধী[২], সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ভেবার রাষ্ট্রকে বলতেন ‘নির্দিষ্ট ভৌগলিক সীমানায় সন্ত্রাস করতে পারার একমাত্র “বৈধ” অধিকার সংরক্ষণকারী মানব-সঙ্ঘ’[৩]। আর এম ম্যাকাইভারের মতে, ‘বলপ্রয়োগের সঙ্গে রাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। উৎপত্তির মূলে, ক্রমবিকাশে, সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টায় এবং রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগ শুধু শেষ ভরসাস্থলই নয় ; তা রাষ্ট্রের আদিম নীতিও বটে। বলপ্রয়োগ রাষ্ট্রের বিশিষ্ট অস্ত্রমাত্রই নয়, তার প্রাণ প্রদীপতুল্য।’[৪] এছাড়াও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ধারণাটাই এমন যে, ব্যক্তি-মানুষ ও সমাজের অজস্রমুখী স্বাধীন উদ্যোগকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দমন করা খোদ তার অস্তিত্বের জন্য অনিবার্য। সার্বভৌম ক্ষমতার সম্মুখে ব্যক্তির শরীর ও জীবন কোন না কোন ক্যাটাগরিতে সদাসর্বদা উন্মোচিত, বধযোগ্য ‘হোমো সাকের’ (বখতিয়ার আহমেদ একে বাংলায় বলছেন ‘ন-মানুষ’)।[৫]

আর্টওয়ার্ক: টর্চার টু ডেথ
শিল্পী: শাহরুখ হায়দারি
সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

হত্যাকাণ্ডটা নিয়ে গোড়ার যে প্রশ্নটা তোলা দরকার তা হলো, হত্যাকাণ্ড কি অবৈধ?[৬] আদালতের নির্দেশ থাকলেই কি রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড কি বৈধ হয়ে যায়? আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটলে সেটা কি বৈধ হয়ে যায়? পুলিশ বা র‍্যাব নিজের হাতে ‘আইন’ তুলে নিয়েছে বলেই কি এই ধরনের হত্যাকাণ্ড ‘বিচারবহির্ভূত’?[৭] নাকি আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার সুযোগ আছে বলেই এমন হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারছে রাষ্ট্রীয় বাহিনী? বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বীভৎস সহিংসা চেহারা বর্তমানে যেভাবে উন্মোচিত, ন্যূনতম মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে এঈ প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই ।

বরগুনার নয়ন বন্ড হত্যাকাণ্ডের পর আদালত খুব সুন্দর ও স্পষ্টভাষায় বলেছেন যে, এই বন্ডরা একদিনে তৈরি হয় না, তারা একটা প্রক্রিয়ার ফসল। অপরাধকে শুধু ব্যক্তির পর্যায়ে না রেখে সামাজিকভাবে দেখার জন্যে আদালত প্রশংসার দাবিদার। এরপরই আদালত বলেছেন যে, ‘আমরা এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং (‘বিচারবহির্ভুত হত্যা’) পছন্দ করি না। হয়তো অনেকসময় প্রয়োজনের খাতিরে অনেক সময় জীবন বাঁচানোর তাগিদে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা করে থাকে।’[৮] আদালতের এই পছন্দ-অপছন্দের সীমানা কতটুকু তা ‘প্রয়োজনের খাতিরে’ ও ‘জীবন বাঁচানোর তাগিদে’ ফ্রেইজের মাধ্যমেই আসলে বলে দেয়া হয়েছে। একই সময় আবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল  বলেছেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো ধরণের বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ডে জড়ায় না। তারা জীবন রক্ষার্থে কখনো কখনো গুলি চালাতে বাধ্য হয়’।[৯] র‍্যাবের মহাপরিচালক  বেনজীর আহমেদ এক সাক্ষাতকারে বলেছিলনে যে, ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ একটি ভুল শব্দ।[১০] তিনি তো উল্টো অবাক হয়েই বলেছিলেন, ‘বিচারবহির্ভুত’ হত্যাকাণ্ড আবার কীভাবে হয়? আদালত-র‍্যাবের মহাপরিচালক-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রত্যেকেই আওয়ামীলীগ সরকারের আমলের কর্তাব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান। র‍্যাব যখন গঠন করা হয় সেই ২০০৪ সালের সরকারি কর্তাব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান সকলের কথার সাথে এই আমলের কথার এক অদ্ভুত মিল লক্ষ্য করা যায়। যেমন, ২০০৪ সালে ২৯ অক্টোবর তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর বলেছিলেন, ‘র‍্যাবের জন্যে ইনডেমনিটির কোনো প্রয়োজন নেই; কারণ সন্ত্রাসীরা র‍্যাবকে আক্রমণ করলে, তখন আত্মরক্ষার তাগিদে র‍্যাবও পাল্টা গুলি করে, এতে করে সৃষ্ট ক্রসফায়ারে সন্ত্রাসীর মৃত্যু ঘটেছে।’ ২০০৫ সালে বি এন পি’র আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তৎকালীন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছিলেন, ‘আমরা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছি। সন্ত্রাসীদের সাথে এটি র‍্যাবের যুদ্ধ। ফলে ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার ঘটনা কোনোভাবেই মানবাধিকারের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়।’[১১] বিএনপি সরকার ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছিল সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে,  আওয়ামীলীগ সরকার ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছে মাদকের বিরুদ্ধে; যে অনন্ত ‘যুদ্ধে’র দোহাই দিয়ে যখন খুশি আসল-ভুয়া মাদকব্যবসায়ী-সন্ত্রাসীদের খুন করা হয়ে থাকে। ক্রসফায়ার সংক্রান্ত কর্তা-ব্যক্তিদের এসব বক্তব্য একটা বিষয় আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, এই দুই রাজনৈতিক দলের যততুকু বিরোধ  তা আসলে মৌলিক কোনো বিরোধ না যেমন তাদের বুদ্ধিজীবীরা দেখানোর চেষ্টা করে থাকেন, বরং তা রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা না থাকা সংক্রান্ত বিরোধ। এর বাইরে এই যে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় থাকার পরেও তাদের বক্তব্যে  অদ্ভুত মিল লক্ষ্য করা যাচ্ছে, এর জন্য এই দুই দলেরই বাংলাদেশের ‘সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্রে’র কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।[১২] কারণ এই সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্রের প্রশ্নে শুধু আওয়ামীলীগ-বিএনপি না, ‘মূলধারা’র প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক দলের মধ্যেই বিরল ঐক্যমত আছে। এজন্য যে মোড়কে যারাই রাষ্ট্রক্ষমতায় যাক না কেন,  স্বৈরতান্ত্রিক নিপীড়ন করার ক্ষেত্রে কি রাজনৈতিক দল কি সুশীল-সামরিক গোষ্ঠী; সব পক্ষই একই পাটাতনে অবস্থান করে। ক্রসফায়ার-এনকাউন্টারের মাধ্যমে নাগরিকের জীবনাবসান এবং  সেই জীবনাবসানের পক্ষে উকালতি করা এই সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্রেরই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।

বর্তমান জমানায় রাষ্ট্র কেবল ‘হাত’ দিয়ে মারে না, রাষ্ট্র ‘মারা’র  অনুকূল এমন এক আবহাওয়া, এমন এক শাসনপ্রণালী নিশ্চিত করে যেন শাসনের যৌক্তিকতা খোদ নাগরিকরাই অনুভব করেন। আইন ও নৈতিকতাকে এমনভাবে পেঁচিয়ে ফেলা হয়েছে যে, নাগরিকদের মনে হয় আইন মাত্রই নৈতিক, বে-আইন তাই অ-নৈতিক। ন্যায়বিচারের নামে সংঘবদ্ধ প্রতিহিংসাকেই ‘যৌক্তিক’-‘ন্যায্য’ বলে প্রচার করা হয়। অথচ ন্যায্যতার প্রশ্নে সহিংস-আরোপিত-স্বৈরাচারী আইনকে ছাপিয়ে যাওয়ার ইতিহাস মানবসভ্যতার অগ্রসরতার ইতিহাস।[১৩] ফলে, যখনই কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটে তাঁকে আইনিভাবে বৈধতা দেয়া খুব জরুরি হয়ে পড়ে, কারণ আইনি বৈধতা কখনো কখনো নৈতিক বৈধতার রূপ ধারন করে, অন্তত জনসাধারণের মনে। ফলে, ক্রসফায়ারের এই আইনি বৈধতা কোথায় লুকিয়ে আছে সেটা সন্ধান করাই এর প্রকৃত রাজনীতি বোঝার জন্য সহায়ক হবে। সাথে এটাও বোঝা যাবে, র‍্যাব মহাপরিচালক বা স্বারাষ্ট্রমন্ত্রী বা আওয়ামীলীগ-বিএনপি’র কর্তাব্যক্তিরা উপরের যে কথাগুলো বলেছেন তা আসলে ‘সঠিক’।

যে কারণেই হোক, আমাদেরকে বোঝানো হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে সকল গুরুত্বপূর্ন অর্জন অর্জিত হয়েছে তার মধ্যে আমাদের সংবিধান একটি। কখনো কখনো বলা হয়েছে, এই সংবিধান ত্রিশ লক্ষের শহিদের রক্তে লিখিত। কথাটা শতভাগ ঠিক, কিন্তু যে সংবিধান রচিত হয়েছে সেটা ত্রিশ লক্ষ শহিদের আত্মত্যাগকে যথাযথভাবে ধারণ করে কি না সেই প্রশ্ন তোলা আমাদের দায়িত্ব। যেমন, সংবিধান হচ্ছে আমাদের রাষ্ট্রপরিচালনার সর্বোচ্চ আইন। কিন্তু আমরা দেখতে পাই, এই ‘সর্বোচ্চ আইন’ ক্রসফায়ার/ বন্দুকযুদ্ধ/ এনকাউন্টার ইত্যাদি বিষয়সমূহের রাস্তা সুগম করার জন্যে খুব সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বিষয়টা ব্যাখ্যা করার পূর্বে কয়টা কেসস্টাডি উল্লেখ করে নিলে এর সাথে সংযোগ স্থাপন করা সহজ হবে।

প্রথম কেসস্টাডি হচ্ছে ২০০৫ সালের সাতক্ষীরায় সঙ্ঘটিত ক্রসফায়ারের ঘটনা। র‍্যাবের সাথে ক্রসফায়ারের কার্তিক ঋষি নামক এক ব্যক্তি নিহত হন। ক্রসফায়ারের সেই ঘটনা পুলিশ/র‍্যাবের প্রসনোট অনুযায়ী নিম্নরূপ ছিল,

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গতকাল দুপুরে তালা থানার পুলিশ তালার আমানুল্লাপুর গ্রামের অমূল্য ঋষির ছেলে কার্তিক ঋষি (৩৫)। কে বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। তার বিরুদ্ধে তালা থানায় ৫টি হত্যাসহ ১১টি মামলা রয়েছে। পুলিশ তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী রাতে তালা উপজেলার জিয়ালা নলতা এলাকায় অস্ত্র উদ্ধার করতে যায়। রাত ৩টার সময় সেখানে পূর্ব থেকে ওত পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা কার্তিক ঋষিকে ছাড়িয়ে নিতে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করে। পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। এসময় সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে কার্তিক ঋষি নিহত হয় এবং পুলিশের নায়েক হুমায়ুন কবীর ও কনস্টেবল জাহাঙ্গীর হোসেন আহত হয়। সন্ত্রাসীরা ৪০ রাউন্ড এবং পুলিশ ১৫ রাউন্ড গুলি ছোড়ে বলে ওসি জানিয়েছে। ঘটনাস্থলে সন্ত্রাসীদের ফেলে যাওয়া ১টি পাইপগান, ১টি বন্দুক ও ৩ রাউন্ড গুলি পুলিশ উদ্ধার করেছে।[১৪]

পত্র-পত্রিকায় পুলিশ/র‍্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী ঋষি কার্তিক একজন ‘ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী’ ও ‘চরমপন্থি’ হিসেবে পত্র-পত্রিকায় স্থান পান। নেসার আহমদ পরবর্তীতে এই ঋষি কার্তিকের স্ত্রী কাননের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন।[১৫] কানন বলেছিলেন, ‘আপনি এই গ্রামের লোকের কাছে শোনেন, সবাই বলবে তার কাছে কোনো বন্দুক পায় নি। আমরা গরিব মানুষ দাদা। বন্দুক দিয়ে কী করব?’ ঋষি কার্তিক যে সন্ত্রাসী ছিল না, বা তার কাছে যে কোনো বন্দুক পাওয়া যায় নি এই বিষয়ে প্রতিবেশিরা সকলেই কাননের বক্তব্যকেই সমর্থন করেছেন। সেখানকার এক স্থানীয় সাংবাদিক জানিয়েছিলেন যে, র‍্যাব যাদেরকে সন্ত্রাসী বা চরমপন্থি বলে ক্রসফায়ার করেছিল এটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। তারা গিয়ে দেখেছেন, নিহতরা একদিকে খুবই দরিদ্র, অন্যদিকে মাইনরিটি। চরমপন্থি বা পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি জনযুদ্ধের সাথে এদের সম্পৃক্ততা দেখিয়েছে আসলে র‍্যাব/পুলিশ। র‍্যাব পুলিশের এই ভাষ্য নিহতদের প্রতিবেশিরাও পর্যন্ত নাকচ করে দিয়েছেন। এই ঋষি কার্তিক ছিলেন ঋষি সম্প্রদায়ের মানুষ, খুব দরিদ্র। সে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সাথে জড়িত ছিল বলে কোনো তথ্য পাওয়া যায় নি। আমাদের মূল উদ্দেশ্য এখানে ঋষিকে নির্দোষ প্রমাণ করা না, বরং অন্যকিছু। তার আগে হাল আমলের আরেকটা কেসস্টাডি দেখা যেতে পারে।

২০১৯ সালের ৫ জুন ঠাকুরগাঁওয়ের ফকিরগঞ্জ সীমান্ত এলাকায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ এক ‘মাদক ব্যবসায়ী’ নিহত হয়ছেন বলে খবরে প্রকাশ পায়। বন্দুকের সেই যুদ্ধে নিহত ব্যক্তি হচ্ছেন মনিরুল ইসলাম বাবুল। সেই ‘যুদ্ধে’র খবর রাষ্ট্রীয়বাহিনীর বরাত দিয়ে পত্রিকা প্রকাশ করে নিম্নরূপে,

গত মঙ্গলবার রাতে ফকিরগঞ্জ সীমান্ত এলাকা থেকে ১১২ বোতল ফেনসিডিল, এক বোতল মদসহ মনিরুল ইসলাম বাবুল আটক হয়। তার দেওয়া তথ্যানুযায়ী গত রাতে বিজিবি সদস্যরা অভিযান চালাতে গেলে ফকিরগঞ্জ বঙ্গবন্ধু বাজারের পাশে একটি ফাঁকা জমিতে হামলার শিকার হন। বাবুলের সহযোগীরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বিজিবি সদস্যদের ওপর এ হামলা চালায়। এ সময় বিজিবি পাল্টা গুলি চালায়। এতে ঘটনাস্থলে মনিরুল ইসলাম বাবুল নিহত হন। পরে ঘটনাস্থল থেকে ৭৫ বেতল ফেনসিডিল ও দেশীয় অস্ত্র এবং নগদ ২২ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।[১৬]

দুটো কেসস্টাডি সরলভাবে পড়লেও ২০০৪ সালের ঘটনা ও হাল-আমলের (২০১৯ সালের) ঘটনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কোনো এক ব্যক্তিকে আটক করা হচ্ছে, তা তিনি ‘মাদকব্যবসায়ী’ হতে পারেন বা ‘চরমপন্থি’ হতে পারেন বা ‘সন্ত্রাসী’ হতে পারেন। তারপর র‍্যাব-পুলিশ-বিজিবি তাঁকে নিয়ে আরো কিছু মালমশলা উদ্ধার করতে যায়। ব্যক্তি যদি মাদকব্যবসায়ী হন তাহলে মালমসলা হবে মদ-ফেনসিডিল-ইয়াবাজাতীয় মাদকদ্রব্য, আর ব্যক্তি যদি ‘চরমপন্থি’ হন তাহলে মালমসলা হবে ‘অস্ত্র’। যাত্রাপথে সেই ব্যক্তিদের সঙ্গী/সহযোগীরা ওঁত পেতে থাকবেন, সময় হলেই ঝাঁপিয়ে পড়বেন র‍্যাব-পুলিশের ওপর। পুলিশ-র‍্যাব-বিজিবি তখন নিজেদের জান বাঁচানোর জন্যে পাল্টা গুলি চালাবে, সেই গুলিতে আটককৃত ব্যক্তিটি ‘নিহত’ হয়ে যাবেন। পরে পুলিশ-র‍্যাব-বিজিবি সেই ‘দেহ’ উদ্ধার করে নিয়ে আসে, সাথে ‘উদ্ধার’ করা হয় মদ, ফেনসিডিল, গুলি, অস্ত্র, টাকা ইত্যাদি। তবে পুলিশ-র‍্যাব-বিজিবির নিশানার এতোই ভালো যে, পুরো একটা গ্রুপ তাদের ওপর হামলা করলেও নিহত হয় শুধুমাত্র আটককৃত ‘আসামী’ যিনি কিছুক্ষণ পর তরতাজা মানুষ থেকে নিছক নিথর ‘দেহে’ পরিণত হন। সাথে এই তথ্যও যুক্ত করা হয় যে, নিহত ‘ব্যক্তি’র নামে থানায় অনেকগুলো মামলা ছিল। ঋষি কার্তিকের নামেও মামলা ছিল বলে তৎকালীন পত্রিকা রিপোর্ট করেছিল, মাদকযুদ্ধে যারা নিহত হয়েছেন তাদের প্রায় সবার বিরুদ্ধে মামলা ছিল বলে পুলিশ সূত্রে জানা যায়।

বাংলাদেশের শতকরা নিরান্নবইজন মানুষ জানেন যে, রাষ্ট্রীয়বাহিনীর বয়ান সবসময় একই থাকে, উপরে যে রকম বর্ণনা করা হয়েছে ঠিক সেই রকম। এমনকি রাষ্ট্রীয়বাহিনীও জানে মানুষ তাদের বয়ানে ন্যূনতম বিশ্বাস রাখে না, তবু তারা একই বয়ান বারে বারে প্রকাশ করে। নিহত ব্যক্তি ঋষি কার্তিকের মতো আপাত নিরীহ দরিদ্র কেঊই হন, বা ‘মাদকব্যবসায়ী’ হন, বা নয়ন বন্ডের মতো একেবারে চিহ্নিত খুনিই হন না কেন রাষ্ট্রীয়বাহিনীর বয়ান সবসময় একই থাকে। কেন বয়ানের প্রকৃতি এরকম এবং কেন একই বয়ান, সেটা অবিশ্বাস্য হলেও, রাষ্ট্রীয়বাহিনীর পক্ষে কার্যকরী ভূমিকা পালন করছে? এই প্রশ্নের  উত্তর খুঁজতে সংবিধানের আশ্রয় নেয়া যেতে পারে।

আর্টোয়ার্ক: গণহত্যা
শিল্পী: শাহাবুদ্দিন

মুক্তিযুদ্ধের পর যে সংবিধান রচনা করা হলো তা ‘বাহাত্তরের সংবিধান’ নামে আমাদের বুদ্ধিজীবী-রাজনৈতিক মহলে পরিচিত, এবং অনেকেই বলেন, ‘আমরা স্বপ্ন দেখি, আবার আমরা একদিন সেই বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাব’![১৭] এই সংবিধানকে প্রশ্ন-সমালোচনা করলে ‘রাজাকার’, ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ হিসেবে লেবেলিং করার ক্ষেত্রে কোনো কোনো ‘বিপ্লবী’ রাজনৈতিক দলও বেশ তৎপর।[১৮] এই ধরনের ‘স্বপ্ন’ ও ‘প্রগতিশীল’ ফতোয়া বিবিধ মিথ তৈরিতে সাহায্য করেছে এবং, সংবিধানকে ক্রিটিকালি দেখার পথ বন্ধ করতে উৎসাহ যুগিয়েছে। এই ‘স্বপ্নে’র সংবিধানের ‘মৌলিক অধিকার’ ভাগের ৩২ নং অনুচ্ছেদে লেখা আছে, ‘আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা হইতে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।’ খুব সহজ ভাষায় খোদাইকৃত এই বাক্যকে ডিকন্সট্রাক্ট করলে যা দাঁড়ায় তা হচ্ছে যে কোনো ব্যক্তিকে জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হতে বঞ্চিত করা যাবে যদি সেটা ‘আইনানুযায়ী’ হয়। বেঁচে থাকার অধিকার আর নিঃশর্ত কোনো অধিকার নয়, বরং সেটা আইনসাপেক্ষ। রাষ্ট্র যদি কারো জীবন নিতে চায় সেটা সে পারবে, কেবল ‘আইনমাফিক’ হলেই হবে। আবার জরুরী অবস্থার মাধ্যমে ‘আইন’ নিজেই নিজেকে রদ করে দিয়ে ‘স্টেট অব এক্সসেপশন’ তৈরি করতে পারে; যে ‘স্টেট অব এক্সসেপশন’ নিজেই আবার ‘বিশেষ পরিস্থিতিকালীন’ তথা জরুরি অবস্থা জারিকৃত সময়ের আইন। এইরকম গোলমেলে পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই ‘আইন’ আগায় । নৃবিজ্ঞানী বখতিয়ার আহমেদের ভাষ্যে, ‘আইনে কি আছে সেটা দিয়ে আইন বোঝা যায় না। আইনকে বুঝতে হয় তার কর্তৃত্ব দিয়ে, সন্ত্রাস দিয়ে, অনুমোদন আদায় দিয়ে এবং তার প্রয়োগ দিয়ে।’[১৯]

ফলে ওয়াল্টার বেনিয়ামিনের উক্তি – ‘state of emergency’ in which we live is not the exception but the rule’[২০] – বর্তমান যুগের রাষ্ট্রপ্রণালী বোঝার গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাসূত্র। বর্তমানকালের রাষ্ট্রের এক্সক্লুসিভিস্ট চরিত্রের প্রথম বৈশিষ্ট্যই হলো রাষ্ট্র নিজেই নিজের ঊর্ধে, নিজেই নিজের ব্যতিক্রম। এই এক্সক্লুসিভিস্ট ও একচেটিয়া সন্ত্রাসী চরিত্রই রাষ্ট্রকে ‘রাষ্ট্র’ করে তোলে। সুতরাং যা রাষ্ট্রের জন্য ‘এক্সসেপশন’, তাই সাধারণের জন্য ‘রুল’ তথা নিয়ম-আইন। রাষ্ট্রপ্রণালীর একেবারে গোড়ার এই দ্বৈততা না বোঝার ‘যৌক্তিক’ পরিণতি হলো যাবতীয় রাষ্ট্রীয় ভায়োলেন্সকে ‘বৈধতা’ – ‘অবৈধতা’র বাইনারিতে ফেলে বুঝতে চাওয়া।

আর্টওয়ার্ক: হোমো শ্যাপিয়েন্স
শিল্পী: এলৈনা অসপিনা
সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

সুতরাং রাষ্ট্রের জন্যে ‘আইনানুযায়ী’ খুব খেলো একটা কথাই বটে। তবে জীবন নেয়ার অধিকার যেহেতু ‘আইনমাফিক’ হতে হবে, সেটারও একটা বন্দোবস্ত করে দেয়া আছে খোদ সংবিধানেই। সংবিধানের ৪৬ নং অনুচ্ছেদে লেখা আছে,

‘এই ভাগের পূর্ববর্ণিত বিধানাবলীতে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোন ব্যক্তি বা অন্য কোন ব্যক্তি জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের প্রয়োজনে কিংবা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে যে কোন অঞ্চলে শৃঙ্খলা রক্ষা বা পুনর্বহালের প্রয়োজনে কোন কার্য করিয়া থাকিলে সংসদ আইনের দ্বারা সেই ব্যক্তিকে দায়মুক্ত করিতে পারিবেন কিংবা ঐ অঞ্চলে প্রদত্ত কোন দন্ডাদেশ, দন্ড বা বাজেয়াপ্তির আদেশকে কিংবা অন্য কোন কার্যকে বৈধ করিয়া লইতে পারিবেন।’

এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কীভাবে ক্রসফায়ার আদতে ‘আইনি ’ হত্যাকাণ্ডই, তা বোঝার চাবিকাঠি হচ্ছে ‘শৃঙ্খলা রক্ষা’, ‘অন্য কোনো ব্যক্তি’, ও ‘কোন কার্য’। এই শব্দবন্ধসমূহ মারাত্মকভাবে অনির্দিষ্ট; ফলে ‘অন্য কোন ব্যক্তি’ ‘ যে কোন কার্য’ যদি শৃঙ্খলা রক্ষা বা পুনর্বহালের জন্যে করে থাকেন তবে তিনি খুব সহজেই তার কৃতকর্মের জন্যে রেহাই পেয়ে যাবেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে মাদক এবং মাদকাসক্তি যদি ‘মহামারী’ আকারে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে বাংলাদেশের মত চরম সহিংস একটা রাষ্ট্রের পক্ষে ‘শৃঙ্খলা রক্ষা বা পুনর্বহালের প্রয়োজনে’ যে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণার কোন বিকল্প থাকেনা, এ নিয়ে কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব না থাকলে আমরা এবার বুঝতে পারব কথিত ‘শৃঙ্খলা রক্ষা’র জন্য এমনকি মাদকব্যবসায়ীদের এক গ্রুপ কর্তৃক আরেক গ্রুপের কোন সদস্যকে খুন করাও ‘অন্য কোন ব্যক্তি’র রাষ্ট্রীয় ‘শৃঙ্খলা রক্ষার’ আওতায় আইনসিদ্ধ ঘটনা হতে পারে। একটা কেসস্টাডি এই কথাগুলো বুঝতে সাহায্য করবে। সরকারদলীয় সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির বেয়াই কক্সবাজারের মাদক ব্যবসায়ী। পুলিশের তালিকায় তিনি ‘ইয়াবা গডফাদার’ ছিলেন। গত ২৫ মে ,২০১৮ সালে প্রতিপক্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে গোলাগুলিতে তিনি নিহত হন। এটা পুলিশের ভাষ্য । আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, প্রতিপক্ষ মাদক কারবারি গ্রুপের গুলিতে বদির বেয়াইয়ের নিহত হওয়ার ঘটনাকেও চলমান ‘মাদক বিরোধী যুদ্ধ’ প্রকল্পের সাফল্য হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেছেন, ‘বদির বেয়াই রেহাই পায়নি, কেউই রেহাই পাবেনা।’[২১] তার মানে কি আমাদের ধরে নিতে হবে, মাদকের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছে সরকার, এই ঘোষণায় একাত্মতা প্রকাশ করেছে মাদকব্যবসায়ীদের কোন কোন গ্রুপ, তারা সগৌরবে অন্য গ্রুপের মাদক পাচারকারীদের হত্যা করছে এবং সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন নেতা এটাকে সরকারের সাফল্য হিসেবে দেখছেন?

আমরা বলি যে, কাদের সাহেবের এই ‘সাফল্য’ দেখতে পাওয়াটা এক অর্থে ভুল না। আসলে কাজটা যদি হয় রাষ্ট্রীয় ‘শৃঙ্খলা রক্ষা’র, এবং সংবিধানে যদি ‘অন্য কোন ব্যক্তির’ ‘কোন কার্যের’ দায়মুক্তি দেয়া থাকে, তাহলে সেই ‘অন্য কোন ব্যক্তি’ মাদকের ব্যাপারীও হতে পারে! সে সূত্রে মন্ত্রী কিংবা পুলিশ এহেন হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করে অসাংবিধানিক কিছু করেন নি, বে-আইনি তো নয়ই।

মানে, রাষ্ট্র এই শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা বা পুনর্বহাল রাখার প্রয়োজনে যা-ইচ্ছা-তাই করার অধিকার সংরক্ষণ করে। আপনি কোনো দাবি-দাওয়া নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন, রাষ্ট্রের কাছে মনে হলো এটা শান্তি-শৃঙ্খলায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে, ফলে সে তখন যা-ই করবে সবই সাংবিধানিকভাবে সঠিক। যদি শান্তি আনয়নের জন্যে ক্রসফায়ারের সাহায্য নিতে হয় তবে সেটাও যে সে করতে পারবে তার একটা ইঙ্গিত উপরের ৪৬ নং অনুচ্ছেদে দেয়া আছে।

সংবিধানে সংজ্ঞানুযায়ী পুলিশ রেগুলেশন এক্ট, পুলিশ আইন, পেনাল কোড ইত্যাদি সবই ‘আইন’। সংবিধানে যার ইশারা দেয়া হয়েছে, আইনে সে মূর্তরূপে হাজির হয়েছে। ফৌজধারী কার্যবিধির ৪৬ ধারা হচ্ছে এমন এক ধারা, যেখানে পুলিশ গ্রেফতার করার জন্যে কি কি করতে পারবে আর কি কি করতে পারবে না সেটা বলে দেয়া আছে। সেই ধারার ৩ নং উপধারায় বলা হয়েছে যে, ‘এই ধারার কোন কিছুই কোন মানুষকে হত্যার অধিকার দেয়না যদিনা সে মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত হতে পারে এমন কোন মামলায় অভিযুক্ত না হয়।’ এই বাক্যটাকে উল্টে পড়লে দাঁড়ায় যে, যদি কোনো ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে এমন মামলায় অভিযুক্ত হয় তাহলে এই ‘ধারা’ সেই ব্যক্তিকে হত্যার অধিকার দেয়। এখন কোনো ব্যক্তি যে মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে সেটা কি অনুমান করে নেয়া হবে? পুরো বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত এটা কীভাবে আন্দাজ করা সম্ভব? স্রেফ হতে পারার ভিত্তিতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী যখন কারোর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে, তার মানে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাহী ক্ষমতার পাশাপাশি বিচারিক ক্ষমতাও উপভোগ করছে। ফলে তাদের দ্বারা সংঘটিত কোন হত্যাকাণ্ডকে আর ‘বিচারবহির্ভূত’ বলার উপায় থাকছেনা। এই ধারার সাথে মিলিয়ে দেখলে আমাদের সহজেই বুঝতে পারার কথা, কেন প্রতিটা ক্রসফায়ার/বন্দুকযুদ্ধের ঘটনার পর ‘নিহত’ ব্যক্তির নামে থানায় একাধিক মামলা থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। একাধিক মামলা থাকা মানে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি, আর এই সম্ভাবনা সৃষ্টি মানে গ্রেফতারের উছিলায় ব্যক্তির জীবন নেয়াটা পুরোপুরী আইনত বৈধ, এবং সাংবিধানিকও বটে। সেই সাথে সংবিধানের ৪৬ নং অনুচ্ছেদের ‘শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা’র দিকে মনোযোগ দিলে র‍্যাব-পুলিশের প্রেসনোটে ‘ওঁত পেতে থাকা চরমপন্থি/ মাদকব্যবসায়ী/ সন্ত্রাসী’দের উল্লেখ থাকার কারণ বোঝা যায়।

এই লাইনে হাঁটতে গেলে পেনাল কোড বা দণ্ডবিধি, ১৮৬০ নামক আইনীয় বস্তুর কাছে এসে আবারো হোঁচট খেতে হয়। এই  দণ্ডবিধির ৪র্থ অধ্যায়ে বলা হয়েছে কোন কোন অপরাধ করলে আসলে সেটা ‘অপরাধ’ বলে বিবেচিত হবে না। ৭৬ ধারায় বলা আছে, ‘কেউ যদি এমন কিছু করে যা করার জন্য সে আইনত বাধ্য অথবা সে ভুলবশত সরলমনে বিশ্বাস করে যে এটা করা তার দায়িত্ব তবে তা করা কোন অপরাধ হবে না’। ঠিক তেমনি আরও কিছু ধারায় আত্মরক্ষার জন্যে খুনের যে অধিকার দেয়া আছে সেটা অপব্যবহার করার ও জনগণকে খুন করার প্রস্তুতির আয়োজন স্পষ্টভাবেই ধরা পড়ে। সার্বভৌম ক্ষমতার এক্সক্লুভিস্ট ‘বৈধ’ সন্ত্রাসের সাথে শাশ্বত ‘আইনের শাসন’ ও ‘ন্যায়পরায়ণ বিচারব্যবস্থার’ মিথকে গুলিয়ে না ফেললে বুঝতে বাকি থাকেনা  কোনটা আত্মরক্ষার তাগিদে, কোনটা সরলমনে কোনটা ভুলবশত কোনটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে কোনটা ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলে তা নির্ধারিত হওয়ার আদৌ কোনো পদ্ধতি নাই।  আর না থাকার কারণেই রাষ্ট্রীয় ক্রসফায়ার এতটা ভয়ঙ্কররূপ ধারণ করতে পারে। এই ‘সরলমনে’ ‘ভুলবশত’ শব্দবন্ধনীর  কারণে রাষ্ট্রীয় বাহিনী আরো নিরঙ্কুশ দায়মুক্তির মাধ্যমে খুনোখুনির অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। ক্রসফায়ারে/ বন্দুকযুদ্ধে নিহত ব্যক্তির পক্ষে যদি কেউ মামলা করেন তবে সেটা থেকে রাষ্ট্রীয় বাহিনী যে কত সহজে রেহাই পেতে পারে তা উপরে উল্লিখিত ফ্রেইজের মধ্যেই নিহিত আছে। এই ফ্রেইজসমূহের ব্যবহার ছাড়াও যদি তদন্তে দেখা যায় পুলিশ গুলি ছুড়তে বা খুন করতে ‘আইনত বাধ্য’ হয়েছিল তখন সেখানেই কেস ডিসমিস। মানে তখনই র‍্যাব-পুলিশের খুনটা ‘বৈধ’। ‘শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা’ ‘সরলমন’ ‘আত্মরক্ষা’ এমন বহু শব্দবন্ধ প্রস্তুত হয়ে আছে রাষ্ট্রীয় হত্যাকান্ডের বৈধতা দেয়ার জন্যে।

তার মানে দেখা যাচ্ছে, আমাদের ‘স্বপ্নে’র সংবিধান ও তার আইন-কানুন এহেন রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডকে হজম করার জন্যে প্রস্তুত হয়ে আছে। অন্যভাবে বলা যায়, এইসকল রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড আসলে সংবিধান মেনেই করা হচ্ছে। এবং এই ক্রসফায়ার/ বন্দুকযুদ্ধ আসলে আইনের বাইরের কোনো বিষয় না। আমাদের আদালত, আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আমাদের র‍্যাবের মহাপরিচালক উনারা আসলে একদিক থেকে সর্বদা সত্য কথাই বলে যাচ্ছেন, আমরা শুধু ধরতে পারছি না। আমরা যতই চেঁচাচ্ছি এইসব ‘বিচারবহির্ভূত’ হত্যাকাণ্ড আমাদের নিরাপদ তন্দ্রা ব্যাহত করছে, এসব হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হবে; তারা আমাদের জবাব দিচ্ছেন, ‘না, এইসব বিচারঅন্তর্ভুক্ত হত্যাকাণ্ড’! তারা রাষ্ট্রীয় ভাষাতে কথা বলছিলেন, তাই তিনি আওয়ামীলীগের মন্ত্রী না বি এন পির মন্ত্রী সেই পরিচয় আর মুখ্য প্রশ্ন হিসেবে হাজির হয় না। যারা ক্রসফায়ারকে আইনি হত্যাকাণ্ড বলে বুঝতে চান না বা পারেন না, রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডের এজেন্সি এবং আইনি বৈধতা কতদূর পর্যন্ত প্রসারিত তা একটু ভেবে দেখতে পারেন!

আর্টওয়ার্ক: এক্সিকিউশন
শিল্পী: ইরে জবেক
সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

তাই, আমাদের সবার আগে স্বীকার করে নিতে হবে এই হত্যাকাণ্ড ‘আইনে’র ভেতরের জিনিস। এর প্রতিবাদ তাই শুধু ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে হবে না, বরং ভুল পথে পরিচালিত হওয়ার সম্ভাবনাও থাকবে। আমরা যদি আসলেই ক্রসফায়ার/ বন্দুকযুদ্ধ/ এনকাউন্টার ইত্যাদি বিষয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে চাই তাহলে খোদ এখানকার ‘আইনি ব্যবস্থা’র মধ্যে লুকিয়ে থাকা সহিংসতার উপাদানকেও চ্যালেঞ্জ জানাতে হবে ।

আমাদের বুঝতে হবে আমাদের এই আইনসমূহ ঔপনিবেশিক; উপনিবেশ আমলে তৈরি হয়েছে জনগণের জীবন ও স্বাধীনতা হরণ করার জন্যে। ব্রিটিশ উপনিবেশ ‘আইন মারফতে’ই শাসন-শোষণ চালাত। বর্তমানে আমাদের রাষ্ট্র যেহেতু সেই আইনসমূহের উত্তরাধিকার বহন করে চলছে, সেহেতু আমাদের রাষ্ট্রও একই কায়দায় ‘আইন সম্মত’ উপায়েই অপরাধে লিপ্ত হয়। আমাদের তাই মূল নজর দিতে হবে খোদ রাষ্ট্রের দিকে। সন্ত্রাস/ অপরাধের রাষ্ট্রীয় ভিত্তিকে কোনরকম নাড়াচাড়া না করে কেবল ‘ব্যক্তির অপরাধ/সন্ত্রাস’ই যখন একমাত্র মুখ্য বিষয় হয়ে যায়, এবং সেই সন্ত্রাস/অপরাধ দমনে রাষ্ট্র যদি পাল্টা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বীভৎস রূপ হাজির করে তখন বুঝতে হবে সামনে বিপদ আছে। এই রাষ্ট্র যে ফ্যাসিবাদী চেহারা ধারণ করবে সেটা স্বাভাবিক। আমাদের রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী চেহারার তাই একটা সাংবিধানিক ভিত্তিও আছে। ফ্যাসিবাদের সাথে ‘সাংবিধানিক নির্বাচনতন্ত্রের’ এসেনশিয়াল কোন বিরোধ নাই।

নোম চমস্কি একবার বলেছিলেন, ‘Everyone’s worried about stopping terrorism. Well, there’s really an easy way: stop participating in it.’ ভাষিক কথকতার মাধ্যমে চেতন-অবচেতনভাবে ‘মহান’, ‘প্রয়োজনীয়’ সন্ত্রাসের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আর যাই হোক খোদ সন্ত্রাস-সহিংসতাকে দূর করা যায় না, এর পাটাতনকেই দৃঢ় করা যায় কেবল ।

[১] প্রবন্ধটি ‘সময়ের ব্যবচ্ছেদ’ বইতে সঙ্কলিত আছে। বইটা প্রকাশ করেছে ‘গ্রন্থিক প্রকাশন’ (২০১৯)

[২] উদ্ধৃতি, সেলিম রেজা নিউটন, ‘নয়া মানবতাবাদ ও নৈরাজ্য এম এন রায়ের মুক্তিপরায়নতা প্রসঙ্গে’, আগামী প্রকাশনী।

[৩] Weber M (edited Owen D and Strong B; translated Livingstone R), The Vocation Lectures (Indianapolis, Hackett Publishing Company 2004)

[৪] আর এম ম্যাকাইভার, আধুনিক রাষ্ট্র, অনুবাদ এমাজউদ্দিন আহমদ, সময় প্রকাশনী, ২০০১।

[৫]  বখতিয়ার আহমেদ, গুম-খুন-আতঙ্ক: শাসন প্রণালী ও হত্যার কথকতা, অরাজ।

[৬] এই বিষয়ে একটা চমৎকার আলাপ দেখা যেতে পারে সেলিম রেজা নিউটনের হত্যাকাণ্ড কি অবৈধ? (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কম, ১৬-১১-২০১৪) প্রবন্ধে।

[৭] দেখা যেতে পারে সারোয়ার তুষারের ক্রসফায়ার-এনকাউন্টার কি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড? (অরাজ) প্রবন্ধ।

[৮] প্রথম আলো, ৫ জুলাই ২০১৯, ‘নয়ন বন্ডরা একদিকে একা একা তৈরি হয় না’।

[৯] প্রথম আলো, ৫ জুলাই ২০১৯, ‘নয়ন বন্ডরা একদিকে একা একা তৈরি হয় না’ 

[১০] প্রথম আলো, ১৮ মার্চ ২০১৮,  ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড একটি ভুল শব্দ’।

[১১] নেসার আহমদ সম্পাদিত ‘ক্রসফায়ার রাষ্ট্রের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড’, ঐতিহ্য, ২০০৯।

[১২] বিস্তারিত দেখা যেতে পারে – বাংলাদেশের সংবিধান পর্যালোচনা’, গণতান্ত্রিক আইন ও সংবিধান আন্দোলন, ২০১৩

[১৩] এই আলোচনার জন্যে সহায়ক হতে পারে পিতর ক্রপোতকিনের, ন্যায় বিচার নামের সংঘবদ্ধ প্রতিহিংসা প্রবন্ধটি। অনুবাদ করেছেন ইস্ক্রা। পাশাপাশি দেখা যেতে পারে পিতর ক্রপোৎকিনের ‘বিদ্রোহের প্রাণস্পৃহা’ (স্বাধীনতা প্রকাশন, ২০১৯)। অনুবাদ করেছেন পার্থ প্রতীম দাস।

[১৪] নেসার আহমদ সম্পাদিত ‘ক্রসফায়ার রাষ্ট্রের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড’, ঐতিহ্য, ২০০৯।

[১৫] নেসার আহমদ সম্পাদিত ‘ক্রসফায়ার রাষ্ট্রের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড’, ঐতিহ্য, ২০০৯।

[১৬] বাংলা ট্রিবিউন, ৬ জুন ২০১৯, ‘ ঠাকুরগাঁওয়ে বিজিবির সঙ্গে “বন্দুকযুদ্ধ”, নিহত ১’

[১৭] মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৪, ‘এক দুই এবং তিন’, বিডিনিউজ

[১৮] আরিফ রেজা মাহমুদ, ভিশন একাত্তর: মুক্তিযুদ্ধ বনাম ৭২’র সংবিধান: রিপাবলিকের মূলনীতি তর্ক, অরাজ

[১৯] বখতিয়ার আহমেদ, ‘গুম-খুন-আতঙ্ক: শাসন প্রণালী ও হত্যার কথকতা’, অরাজ।

[২০] The tradition of the oppressed teaches us that the ‘state of emergency’ in which we live is not the exception but the rule., ‘On the Concept of History’, Walter Benjamin

[২১] আরটিভি অনলাইন, ২৫ মে ২০১৮, বন্দুকযুদ্ধে এমপি বদির বেয়াই নিহত, প্রথম আলো, ২৬ মে ২০১৮, বেয়াই রেহাই পাননি, অভিযোগ প্রমাণ হলে বদিও পাবেন না

অরাজ

অরাজ

অরাজ

অরাজ