অরাজ
আর্ট্ওয়ার্ক: রামা ্ওন্ড হানুমান শিল্পী: আপ্পাম রাঘব সূত্র: আর্টিক

ধীমান দাশগুপ্ত।। আফগানিস্তানই কি ‘রামায়ণ’ মহাকাব্যের প্রেক্ষাপট?

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

আজ আমরা ‘মানবিক অনুষদ’-এর বিষয় বলে যেসব বিষয় পড়ছি, এই গোটা অনুষদেরই মূল বা আদিতম বিষয় নাকি ছিল ইতিহাস। এমনটা সম্ভবত একারণেই বলা হয়ে থাকে যে, জ্ঞান প্রপঞ্চে প্রতিটি শাখারই একটি ইতিহাস থাকে— এমনকি গণিত অথবা জ্যোতির্বিদ্যার মত বিমূর্ত বিষয়গুলোতেও—আর ইতিহাসের প্রতিটি টুকরোরই রয়েছে একটি ভূ-প্রাকৃতিক প্রেক্ষিত বা পরিসর।

হেরোডোটাস (৪৮৪-৪২৫ অব্দ, গ্রিক-অধিকৃত তুরষ্কে জন্ম ও মৃত্যু), যাকে ইতিহাসের জনক বলা হয়, তিনি চার পার্সী সম্রাটের রাজত্বকাল ও তাঁদের সময়ের জীবন ও সমাজের আলেখ্য নিষ্ঠার সাথে লিপিবদ্ধ করেন। হেরোডোটাসের জীবনকাল কেটেছে গ্রিস ও পারস্যের ভেতর অবিরাম সঙ্ঘাতের সময়। এবং গ্রিস-পারস্য লড়াইয়ের কিছু ভৌগোলিক প্রেক্ষিতও ছিল।

হেরোডোটাস তাঁর ঐতিহাসিক বিবরণে ‘ভারতে’র কথাও বলেন যেখানে হিমালয়ের পাবর্ত্য মুষিককে স্বর্ণ রেণুতে স্নান করতে দেখা যায় । আরো অনেক পরে, তাঁর রচনাকর্মের বিনির্মাণের মাধ্যমে এমন উপসংহারে পৌঁছানোই যায় যে ঐতিহাসিক প্রতিজ্ঞার মহান জনক হেরোডোটাস উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ পার হয়ে হিন্দুকুশ অবধি পৌঁছেছিলেন।

এই বিষয়টি একইসাথে একটি প্রশ্নেরও জন্ম দেয় যা হেরোডোটাস নিজেকে নিজে করেননি: তিনি ‘ভারতে’ ভ্রমণ করে  থাকলে সেটা কোন্ ভারত ছিল? কিম্বা তিনি ‘গ্রিক’ হয়ে থাকলে, কোন্ ‘গ্রিসে’ বাস করতেন? একইভাবে, রামায়ণের রাম যদি কোন ‘ভারতীয়’ হয়ে থাকেন, তবে এই ‘ভারত’ কোথায় অবস্থিত ছিল?

আর্ট্ওয়ার্ক: লর্ড রামা
শিল্পী: আপ্পাম রাঘব
সূত্র: আর্টিক

তথাকথিত রাম সেতু

একটি জাহাজ যেটা আরব সাগর থেকে বঙ্গোপসাগর অবধি যাত্রা করবে, তাকে ভারত মহাসাগর হয়ে শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ অবধি পার হয়ে অগ্রসর হতে হবে। এই জাহাজ যাত্রাটিই আরো ৩০ ঘন্টা সংক্ষিপ্ততর হতে পারত যদি এটি ভারত ও শ্রীলঙ্কাকে বিচ্ছিন্নকারী মান্নার উপসাগর পার হতে পারত, তবে সেটি সম্ভব নয়। কারণ দু’দেশের ভেতর সেতুর মত প্রসারিত ৪৭ কিলোমিটারের মত একটি স্থাণ আছে যেখানে চারপাশে সমুদ্রের জলে ডুবে যাওয়া অসংখ্য ছোট ছোট পাথর বা শিলা রয়েছে। ফলে এখানে সমুদ্র মাত্র এক থেকে ত্রিশ মিটার গভীর যা পাল তোলা বা নৌযাত্রার পক্ষে অনুকুল নয়।

বৃটিশ ঔপনিবেশিক সরকার ও স্বাধীন ভারত সরকার উভয়েই প্রায়ই এই প্রণালীটি ড্রেজিং বা খনন করে নৌযাত্রার উপযোগী করতে চেয়েছেন তবে বিষয়টি অধরা বা কাল্পনিকই রয়ে গেছে। বর্তমানে হিন্দুত্ববাদীরা বিশ্বাস করছেন যে এই এলাকাটিই রামায়ণে বর্ণিত বানর সেনাবাহিনীর হাতে গড়া সেই সেতু যা রাম ও লক্ষণ শ্রীলঙ্কা বা লঙ্কা বিজয় তথা লঙ্কা যাত্রার জন্য তৈরি করেছিলেন। হিন্দুত্ববাদীরা তাই ড্রেজিংয়ের কথা দূরে থাকুক, উল্টো ‘দ্য আর্কেওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’-কে এই স্থাণটিকে ‘জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ’ হিসেবে ঘোষণার অনুরোধ জানায়।

বৃটিশ ঔপনিবেশিকরাও কিন্তু কম মৌলবাদী ছিল না। ১৮০৪ সালে এক বৃটিশ মানচিত্রকার অ্যাডাম বা আদমের সেতু হিসেবে এই এলাকাটিকে নামকরণ করেন। তিনি মনে করেছিলেন যে বাইবেলে এই সেতুর কথাই বলা হয়েছে যা পার হয়ে আদম বা অ্যাডাম একটি পাহাড় চূড়ায় উঠে পরবর্তী ১,০০০ বছর এক পায়ে খাড়া হয়ে ধ্যান করেছেন।

এর আগেও অবশ্য আমরা দেখেছি মার্কো পোলো এই কাঠামোটিকে একটি সেতু হিসেবে বর্ণনা করছেন যেমনটা আল বিরুনীও তাঁর ১০৩০ অব্দে লেখা বইয়ে করেছেন। সোজা কথায়, ভারত-শ্রীলঙ্কা সমুদ্রপথে জলের অল্প নিচে সার সার পাথর বা শিলার উপস্থিতিকে বহু বহু যুগ ধরেই ‘সেতু’ হিসেবে অনেকেই মনে করেছেন।

ঠিক সেতুও নয়

ভূ-তাত্ত্বিকদের মতে এই কাঠামোটি মূলত বেশ কিছু চুনাপাথরের সমষ্টি যা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হয়েছে। তিনশো থেকে ত্রিশ মিলিয়ন বছর আগে, ভারত উপমহাদেশের একটি এলাকা মহাদেশীয় প্রবাহ বা মহীসঞ্চরণের কারণে ভেঙ্গে গিয়ে শ্রীলঙ্কা গঠন করে বলে ধারণা করা হয়। প্রাকৃতিক এই ঘটনা ঘটার সময় ভারত উপমহাদেশের ভূমির একটি অংশ সমুদ্রের জলে পেছনে থেকে যায়, যা কিনা এই তথাকথিত সেতুর জন্মের কারণ বলে মনে করা হয়।

ইতিহাসের কোন না কোন সময়ে সমুদ্রের তলদেশ থেকে উপমহাদেশের ছিন্ন এই শিলারাশি মাথা তোলে যাকে হয়ত সেতু হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে। তবে এখনো এবিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে যে, এই সেতুর ব্যবহারকারীরা রামায়ণের যুগের মানুষ কিনা। কারণ শ্রীলঙ্কার অধিবাসীরা সরাসরি প্রস্তর যুগ থেকে লৌহ যুগে চলে যায়; তাম্র বা তামার ব্যবহার সেখানে খুব ছিল না। অন্যদিকে ‘রামায়ণ’ হলো অগ্রসর তাম্র যুগের কাহিনী- লৌহ যুগের প্রায় দুই থেকে তিন হাজার বছর আগের এক মহাকাব্য যা বিধৃত হয়েছে গোটাটাই অনবদ্য সব কবিতার চরণে।

রামায়ণের ঘটনাগুলো ঠিক কোথায় ঘটেছিল?

প্রারম্ভিক কথা-বার্তা বাদ দিয়ে মূল প্রসঙ্গে যাওয়া যাক। ‘রামায়ণে’ বর্ণিত লঙ্কা যদি আজকের শ্রীলঙ্কা না হয়ে থাকে, তবে সেটি কোথায় অবস্থিত ছিল?

তাহলে রাম ঠিক কোথাকার মানুষ ছিলেন?  যেখানেই তিনি বাস করুন না কেন, অবশ্যই তিনি আজকের গাঙ্গেয় উপত্যকার মানুষ ছিলেন না, অথবা ‘রাম জন্মভূমি’ অযোধ্যার মানুষও ছিলেন না। কারণ লৌহ যুগের আগ অবধি সভ্য মানুষেরা সেসময় ঘন অরণ্য আচ্ছাদিত গাঙ্গেয় উপত্যকায় বাস করত না। কারণ লোহা আবিষ্কার করার আগে ঘন অরণ্যজাল ছিন্ন করার মত কুঠারই ত’ তখনো প্রচলিত হয়নি। লোহা ছিল না বলেই তখনো তরবারি বা তলোয়ারও ছিল না, যা প্রমাণ করে যে ‘রামায়ণ’ কিন্তু ‘মহাভারত’-এর মত গাঙ্গেয় উপত্যকার মহাকাব্য নয়। গোটা মহাকাব্যে তলোয়ারের কোন উল্লেখ নেই- তীর আর ধনুকই এখানে প্রাথমিক অস্ত্র।

আর্টওয়ার্ক: এক্সপ্লোরেশন
শিল্পী: রাজেশ কে. শিং
সূত্র: পিনটারেস্ট

এই নিবন্ধের মূল লক্ষ্য ‘রামায়ণে’র ভৌগোলিক এলাকাকে নির্দিষ্ট করা। এই অধম নিবন্ধকার সেই উত্তরে পৌঁছতে পারেন নি, ম্যাক্স মুলারের মত ভারতবিদ বা কোন ঐতিহাসিক বা প্রত্নতাত্ত্বিকও পারেননি। রাজেশ কোচ্ছাড়ের মত ইতিহাসানুরাগী এক পদার্থবিদ তাঁর বৈদিক জনতা- তাদের ইতিহাস ও ভূগোল গ্রন্থে  ইতিহাসের সনাতন কৌশলগুলো ভেঙ্গে এ প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই খুঁজে পেয়েছেন।

‘রামায়ণ’ কিভাবে ‘মহাভারত’ থেকে পৃথক?

‘রামায়ণ’ ও ‘মহাভারত’-এর মৌলিক পার্থক্য এই দুই মহাকাব্যে বর্ণিত নদ-নদী ও দেব-দেবীর বিবরণ থেকেই বোঝা সম্ভব। ‘মহাভারত’-এ গঙ্গা ও যমুনা দুই সর্বব্যাপী নদী অথচ ‘রামায়ণ’-এ এই দুই নদীর কোন উল্লেখই নেই। ‘মহাভারত’-এ ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে অথচ ‘রামায়ণে’ এই হিন্দু ত্রি-দেবতার কোন উল্লেখ নেই। ‘ঋগ্বেদে’-ও এই দুই নদী এবং এই ত্রি-দেবতার কোন উল্লেখ নেই। কিন্ত ঋগ্বেদে যে দুই নদী সরস্বতী এবং সরযূ ও তিন দেবতা অগ্নি, বরুণ ও পবনের উল্লেখ পাওয়া যায়, তাদের উল্লেখই ‘রামায়ণে’ও মিলছে। এ থেকে এটুকু সহজেই অনুমান করা যায় যে ‘রামায়ণ’ ছিল এক ঋগ্বেদীয় মহাকাব্য। কিন্তু ঠিক কোন সময়ের? আমাদের বর্তমান দিনপঞ্জি ব্যবহার করে এটা অনুমান করা ঠিক হবে না এবং সেটা সম্ভবও না। ঘটনাক্রমের ধারাবাহিকতা থেকেই আমরা বরং এমন কিছু অনুমান করতে পারি।

‘সোমরসে’র উল্লেখ

পূর্ব ইউরোপ থেকে বৈদিক জনতা ব্যাক্ট্রিয়া বা আজকের আফগানিস্তানে ভ্রমণ করতে করতে পৌঁছে যায়। সেখান থেকে তারা চলে যায় পারস্য (আজকের ইরান)। পারস্যে অভিবাসনের সময় সম্ভবত দেবতাদের ভেতর ক্ষমতা নিয়ে এক যুদ্ধে আবেস্তান ধর্মের জন্ম হয়। এজন্যই দেবতাদের রাজা ইন্দ্র ‘আবেস্তা’য় এক গৌণতর প্রতিভূ হিসেবে দেখা দেন যখন মৃত্যুর দেবতা যম কিনা হন ‘আবেস্তা’-র সেরা দেবতাদের একজন। অগ্নিকে পার্সীরা আজও প্রবলভাবে উপাসনা করে অথচ হিন্দুরা এই প্রাচীন দেবতাকে আর পূজা করে না। পারস্যে যাবার আগেই ঋগ্বেদীয় যুগের ঘটনাবলী ঘটেছিল। কোচ্ছাড় ইতোমধ্যেই যথেষ্ট স্বাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন যে রামায়ণের ঘটনাটি বৈদিক জনতার দীর্ঘ যাত্রা বা অভিবাসন পথের আফগান শাখার আলেখ্য কিনা?

কোচ্ছাড় প্রথম যে প্রমাণ দাখিল করেন সেটা হলো বৈদিক পানীয় সোমরস। প্রাচীন বৈদিক জীবনে এই পানীয়ের এতটাই গুরুত্ব ছিল যে ঋগ্বেদে একটি গোটা ‘মণ্ডল’ বা অধ্যায়ই রয়েছে এই পানীয় নিয়ে। ‘ ‘সোম’-এর গুরুত্ব আভেস্তীয় জেন্দ গ্রন্থেও রয়েছে- পারস্যে ‘সোম’কে বলা হচ্ছে ‘হোওমা।’ আরো দেখা যাচ্ছে যে বৈদিক যাযাবর জনগোষ্ঠি যতই ভারতীয় উপদ্বীপের কাছে অগ্রসর হচ্ছে ততই তারা সোমলতার নতুন বিকল্প খুঁজছে। সোমরস এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাদের জীবনে।

কিন্ত মূল সোমলতা বা তৃণটি খুঁজে পাওয়া যায় নেহাতই আজকের আফগানিস্তান আর পারস্য বা ইরানে। ১৯৫১ সালে জার্মান ইতিহাসবিদ কার্ল ফ্রিডরিখ গেল্ডনার প্রমাণ করেন যে, এফেড্রা তৃণলতাটিই ছিল ঋগ্বেদে বর্ণিত সোম। এফ্রেড্রিন বা সোমরস ঠিক মদ নয়—এই নেশা ধরানো লতাটি মূলত: ‘অ্যালক্যালোয়েড’— ‘অ্যালকোহল’  নয়।  কোচ্ছাড়ের অনুসন্ধান থেকে আফগানিস্তান, ইরান, হিমালয়ের উত্তরাংশ ও হিন্দুকুশে ‘এফেড্রা’র চার রকমের নমুনা পাওয়া যাচ্ছে।

‘উত্তরায়ণ’ থেকে আমরা কি শিখি?

ঋক ও যজুর্বেদে মোট ৪৯টি মহাজাগতিক স্তোত্র রয়েছে যার অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়নি। তবে, বেদাঙ্গ জ্যোতিষের একটি বিশেষ স্তোত্র আমাদের বছরের দীর্ঘতম দিন বা উত্তরায়ণ সম্পর্কে জানায় যা কিনা দিনের আলোর ১৮টি পর্ব ও রাতের ১২টি পর্বের সম্মিলনে গঠিত। বিষুবরেখায় দিন ও রাত্রিসমূহ সম দৈর্ঘ্যের হয়ে থাকে; তবে উচ্চতর অক্ষাংশে গরমের দিনগুলো রাতের থেকে দীর্ঘতর হয়ে থাকে। যে বিশেষ অক্ষাংশে দিবালোক ও নৈশ অন্ধকারের অনুপাত ৩:২ সেটা ৩৪ ডিগ্রি উত্তরে হয়ে থাকে। এটা বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে বর্তমান পৃথিবীতে ঠিক এই অক্ষাংশে যে নগরীদ্বয় পাওয়া যাচ্ছে সে দু’টো হলো আফগানিস্তানের হেরাত ও কাবুল।  সোজা ভাষায় বললে, বেদাঙ্গ জ্যোতিষ রচনার সময় ও স্থান বৈদিক যুগের আফগানিস্তান ও ইরানের সাথে মিলে যায়। রাজেশ কোচ্ছাড় দ্বিতীয় যে স্বাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করছেন সেটাও ঋগ্বেদের স্থান ও সময় বর্ণনা সম্পর্কে আমাদের ভাবনাকে আরো জোরালো করে।

নদীগুলোর সন্ধানে

সরস্বতী ও সরযূ নদীর সন্ধানে কোচ্ছাড় ঋগ্বেদের বিনির্মাণ করেছেন আর এটাও লক্ষ্য করেছেন যে ‘রামায়ণে’ এই দুই নদীই উপস্থিত। আর এখান থেকেই আমাদের আধুনিক ইতিহাসেরও সূচনা।

উত্তর প্রদেশেও সরযূ নামে এক শীর্ণকায়া নদী আছে যা ঘাঘারায় প্রবাহিত হয়ে অন্তিমে গঙ্গায় মেশে। অনেক ভারতীয় আবার বর্ষার সময় জলে পুষ্ট হয়ে ওঠা আরাবল্লীর সরস্বতী নদীকে, যে নদী কিনা ঘাগগড়ের অববাহিকার পাশ দিয়ে বয়ে (ঘাঘারার সাথে মিলিয়ে ফেলা যাবে না),তাকেই পৌরাণিক সরস্বতী নদী মনে করেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৯ নাগাদ রুশ ল্যান্ডসেট ভূ-উপগ্রহ চিত্রে উত্তর-পশ্চিম ভারতের ছবির স্ক্যান দেখে ঘাগগরকে এক বড় বা প্রশস্ত নদী মনে হওয়াই স্বাভাবিক। নদীটি পরে কছের রানে গিয়ে মিশেছে।

রুশ স্যাটেলাইটের তোলা চিত্র থেকে এক শুকিয়ে যাওয়া প্রাচীনতর নদীর দেখা মেলে যা কোথাও কোথাও ৮ কিলোমিটার প্রশস্ত। এই ছবি দেখেই অনেকে এই নদীখাতকে আদি সরস্বতী নদীর অববাহিকা হিসেবে সিদ্ধান্ত টেনেছেন।

নীল রবার্টসের ‘দ্য হলোসিন’ গ্রন্থ থেকে এটা পরিষ্কার যে এই নদী উত্তরে কছের দিকে যে প্রশস্ত হয়েছে তা’ মূলত তুষার যুগে একটি হিমবাহের দ্রুতগতি প্রবাহের দরুণই হয়েছে। কিন্ত, ঋগ্বেদের বিনির্মাণ থেকে এমন কিছু মেলে না। বেদের অন্তিমে সরস্বতীকে দীর্ঘজীবী কোন নদী হিসেবে স্বীকার করা হয়নি। ঘাগগরের মূল স্রোত আজকের পাকিস্তান থেকে ভারতে প্রবেশ করেছে যা কিনা থর মরুভূমিতে শুকিয়ে যায়। কোচ্ছাড় মনে করেন এই সরস্বতী নদী দীর্ঘ বর্ষজীবী নয়।

অথচ, ঋগ্বেদে সরস্বতী নদী খুবই শক্তিমতী যে কিনা খর প্রবাহে সব শিলারাশি চূর্ণ করে। তার গর্জন ছাপিয়ে যায় চারপাশের সব শব্দ। এবং ঋগ্বেদের সরযূ নদী অবিশ্বাস্যরকম প্রশস্ত ও গভীর- নদী মাতৃকা। বর্তমান ভারতে সরযূ ও সরস্বতী নামে যে দুই নদী দেখা যায় তার সাথে ঋগ্বেদের নদীদ্বয়ের কোন মিল নেই।

আর্টওয়ার্ক: ধরম
শিল্পী: রাজেশ কে. শিং
সূত্র: পিনটারেস্ট

ঋগ্বেদের স্ত্রোত্র বা সুক্ত নং ৫/৫৩/৯-এ বলা হচ্ছে: ‘রস, ক্রুমু, অনিতাভ, কুবা অথবা সিন্ধু নদ যেন তোমাদের থামাতে সক্ষম না হয়, গভীর সরযূ-ও যেন তোমাদের চলার পথে প্রতিবন্ধক না হয়।’ এই নদীগুলোর ধারাক্রম স্পষ্টত পূর্ব থেকে পশ্চিমের দিকে যাত্রা করছে। সুতরাং সরযূ নদী অবশ্যই সিন্ধু নদের পশ্চিমে প্রবাহমান।

কোচ্ছাড় ধারণা করেন যে আফগানিস্তানের হরি-রুদ নামে পরিচিত ৬৫০ কিলোমিটার নদীটির উদ্ভব হিন্দুকুশ পর্বতে। এই নদীটিই হেরাত নগরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ইরান-আফগানিস্তান সীমান্তের পাশে ১০০ কিলোমিটার বয়ে মধ্য এশিয়ার কারাকোম মরুতে মিলিয়ে যায়।

‘আবেস্তা’-য় আমরা সরস্বতী নদীকেই হরাহৈতি নামে উল্লিখিত হতে দেখছি — শব্দদ্বয়ের ধ্বনিগত সাযুজ্যও লক্ষ্যনীয়— যা কিনা পরে আফগান-ইরান সীমান্তে আরগান্ধার নদীর যৌথ অববাহিকা এবং হেলমন্দ নদী পার হয়ে ইরানে প্রবেশ করছে। কোচ্ছাড় মনে করছেন এই হেলমন্দ নদীই বৈদিক সরস্বতী নদী।

হেলমন্দ নদীর উদ্ভব কহ-ই-বাবা পর্বতশৃঙ্গে। আফগানিস্তানের বুক চিরে ১,৩০০ মাইল প্রবাহিত হয়ে বৈদিক সরস্বতী নদী বৈদিক দৃশদ্বতী বা আজকের আরগান্ধার নদীতে মিশছে। আবেস্তায় এই প্রশস্ত নদীকে ‘হেতুমন্ত’ বা ‘সেতুমন্ত’ নদী হিসেবে বলা হচ্ছে। ইরানে সরস্বতীকে ‘হরাহৈতি’ বলা হচ্ছে যা উত্তর ইরানের সাইস্তান এলাকায় ‘হামুন-ই-সাবরি’ নামে অভ্যন্তরীণ হ্রদে সবশেষে মিশে যাচ্ছে।

সমাপ্তি

প্রাচীন যুগের বিশেষত  তাম্র যুগের রাজনৈতিক মানচিত্র আমাদের এক অসাধারণ বোধ উপহার দেয়। সেসময় বিশ্বের দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তি- পার্সী ও গ্রিক- এই দুই সভ্যতাই লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগরের মধ্যবর্তী এলাকার ভেতরে অবস্থিত ছিল। দু’টো সভ্যতার কোনটাই উপকূলীয় সভ্যতা নয়।

এটাই জন্ম দিচ্ছে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের। প্রাচীন মানুষ সমুদ্র বলতে কি বুঝিয়েছে? ভূ-মধ্যসাগর, লোহিত সাগর আর কাস্পিয়ান সাগর বলতে যা কিছু বলা হয় সবই ত’ আসলে লবন জলের হৃদ এবং ঠিক যে অর্থে আমরা আজকের দিনে সমুদ্র বলতে যা বুঝি তা’ নয়। কাজেই এমন প্রশ্নও আসতেই পারে যে ‘রামায়ণে’র লঙ্কা হয়ত আসলে ছিল ‘হামুন-ই-সাবরী’র কোন দ্বীপ।

একটি জিনিস পরিষ্কার: রাম ও লক্ষণ আফগানিস্তান থেকে যত দূরেই যান না কেন, সেটা আজকের শ্রীলঙ্কা হবে না। কারণ সেক্ষেত্রে তাদের ভারতীয় উপদ্বীপ অতিক্রম করতে হত। এবং যেহেতু লঙ্কেশ্বর রাবণও সোমরস পানীয় উপভোগ করতেন, তিনিও নিশ্চিত সীতাকে হরণের পর সোমলতা যে ভূখন্ডে জন্মায় সেখান থেকে খুব দূরে যাবেন না।

আর্টওয়ার্ক: সীতা সয়ম্বর
সূত্র: পিন্টারেস্ট

পুরাতাত্ত্বিকভাবে প্রমাণ করা সম্ভব না হলেও এমনটা অনুমান করার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে যে, দশরথের বংশ (এবং রাম) বা ইক্ষাকুরা আসলে পশ্চিম আফগানিস্তান থেকে এসেছিল। কারণ পুরাণে বলা হচ্ছে যে রাজা কুবালস সবরীর তীরে এক দৈত্যকে বধ করেন। আর সরস্বতী নদী যেখানে সমুদ্রে মিশেছে সেখানে বিশ্বামিত্র তাঁর দ্বিতীয় জন্ম গ্রহণ করেন। এবং বাল্মিকীও সীতাকে সরযূর তীরেই আবিষ্কার করেন। কাজেই সন্দেহের তেমন একটা অবকাশ নেই যে ‘রামায়ণে’ বর্ণিত সমুদ্র মূলত আজকের ‘হামুন-এ-সবরী’ আর তার কোন একটি দ্বীপই রাক্ষসরাজা রাবণের লঙ্কা।

ভারতের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস যারা অধ্যয়ন করতে চান তাদের মনোযোগের কেন্দ্রে হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসবিদরা একথা বলে সবসময়ই থাকতে চেয়েছেন যে পশ্চিমা ঐতিহাসিকরা প্রাচীন ভারতের শেকড় সনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। বালগঙ্গাধর তিলক বা তাঁর চেয়ে কম বিখ্যাত ঐতিহাসিকদের লেখায় আমরা এমন কথা পাই।

এটা সত্যিই অবাক করা যে, কিভাবে বৈদিক রচনাবলী থেকে যে সত্য ফুটে ওঠে তার সাহায্য ব্যতীতই সম্পূর্ণ মনগড়া ও সহজ নানা উপসংহারকে সহজে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা রাজনীতির এক বিশেষ মার্কার প্রতি ভাবনাহীন আনুগত্য অর্জনের কাজে লাগানো সম্ভব।

ভারত ও শ্রীলঙ্কার ভেতরে সমুদ্রপথে সেতুর মত যে শিলাবিন্যাস দেখা যায় তা’ সংরক্ষিত হোক, তবে রাম সেতু বা আদম সেতু হিসেবে নয়। এটাকে একটি ভূ-প্রাকৃতিক নিদর্শন হিসেবেই সংরক্ষণ করা  হোক। কারণ আজকের লঙ্কা ও ‘রামায়ণে’র লঙ্কার ভেতর আসলে তেমন কোন সম্পর্কই নেই।

 

 

অদিতি ফাল্গুনী

অদিতি ফাল্গুনী

অদিতি ফাল্গুনী

অদিতি ফাল্গুনী