অরাজ
আর্টওয়ার্ক: ফ্রিডম অব থটস শিল্পী: ইগোর লাকিয়ানচেনকো সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসন অর্থায়ন ।। রাষ্ট্র-বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্ক পাঠ: মুক্তিপরায়ন রূপকল্প

  • আরিফ রেজা মাহমুদ

…University will not be manufactory of slaves. We want to think truly, We want to teach freedom… Freedom first, freedom second, freedom always.

বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বজনীন জ্ঞান সৃজন ও চর্চার  ক্ষেত্র। মনুষ্য-জীবনের উৎকর্ষ সাধন কিংবা ‘মুক্ত মানুষের মুক্ত সমাজ’গড়ার জন্য জ্ঞান উৎপাদন ও তার চর্চা সমাজে প্রবাহমান রাখাই বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য। কিন্তু সৃজনের পূর্বশর্ত হলো স্বাধীনতা। স্বাধীনতা ছাড়া কোনো সৃজন হতে পারে না। স্বাধীনতাহীনতায় চর্চিত জ্ঞান বড় জোর ‘দক্ষ’উৎপাদন করতে পারে, জ্ঞানী নয়।  যে-সমাজে সৃজন রুদ্ধ, সে-সমাজে জ্ঞানও রুদ্ধ। ফলে স্বাধীনতাহীন বিশ্ববিদ্যালয় মূলত নিশ্চল বিশ্ববিদ্যালয়। স্বাধীনতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ, বিশ্ববিদ্যালয় ধারণারই অংশ।

জ্ঞানচর্চার জন্য স্বাধীনতা অপরিহার্য। কেননা সত্য কোন রাষ্ট্রিক বিধি, কোন সামাজিক নিষেধ, ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলে না। জ্ঞান ও সত্যের সঙ্গে মিল নাও হতে পারে প্রথাগত সামাজিক, রাষ্ট্রিক, ধর্মীয় বিশ্বাসের; এবং না হওয়ায় স্বাভাবিক, কেননা প্রথা না এড়াতে পারলে জ্ঞানের অগ্রগতি অসম্ভব। যে জ্ঞান প্রথা পরিক্রমায় ব্যাস্ত, তা কোন জ্ঞান নয়। সভ্যতার ইতিহাস প্রথা ও মুক্তজ্ঞানের সংঘর্ষে পরিপূর্ণ।

স্বাধীনতা অর্জনে কর্তৃত্বপরায়ন চার্চ আর রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়কে দীর্ঘ লড়াই করতে হয়েছে। ইউরোপে রেনেসাঁ, সংস্কার আন্দোলন ও শিল্প বিপ্লবের ফলে, গোটা ইউরোপে বিশেষ করে, ইংল্যান্ডের সমাজে যে, গুণগত পরিবর্তন সাধিত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় তার বাইরে থাকেনি। ক্রমান্বয়ে ক্যাথলিক চার্চের ক্ষমতা হারানো, রাজতন্ত্র ও এঙ্গেলিকান চার্চের ক্ষমতা প্রাপ্তি ও পার্লামেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি ইত্যাদি পরিবর্তন বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্রকে পাল্টে দিয়েছে। আবার একই সঙ্গে ‘আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি’কিম্বা ’পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘুরছে’বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাগুরুর এই আবিস্কার সূচনা করেছে সমাজ পরিবর্তনের। আদতে সামাজিক প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তনই তো সমাজ পরিবর্তন।

আধুনিককালে বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে রাষ্ট্রের ভেতরে মুক্তাঞ্চল। স্বায়ত্বশাসন এই মুক্ততার ভিত্তি। উচ্চ শিক্ষা সংক্রান্ত ইউনেস্কো ঘোষণার মধ্য দিয়ে আজ তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।

Autonomy is indispensable to the role and work of the university. Today it is deffentiated organisational autonomy, academic autonomy and finacial autonomy

পাবলিক রিপাবলিক ও বিশ্ববিদ্যালয়

উপনিবেশিকতার মধ্য দিয়ে এই জনপদে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মুক্তিমুখীন প্রভাব পড়ে এর উপরে। কার্যত এর ফলে মৌখিকভাবে হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন কথাটা স্বীকৃতি পায় রাষ্ট্রের তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর কাছে। প্রণীত হয় ৭৩ এর অধ্যাদেশ।

ধারণাগত ভাবে বিশ্ববিদ্যালয় সমাজের সবচেয়ে স্বাধীন ক্ষেত্র বলে বিবেচিত হলেও বাস্তবে তা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের শেকলে বাঁধা। রাষ্ট্রের চরিত্র এখানে সাংবিধানিকভাবে দলতান্ত্রিক। কিসের ভিত্তিতে কিভাবে একটি রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা হয় সেই আলোচনাই ঢুকব আমরা।

রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে রিপাবলিক ধারনাটিকে দাসত্ব মুক্তির হাতিহারে রূপান্তর করেছেন ফরাসি চিন্তাবিদ রুশো (১৭৭২-১৭৭৮)। রাজশাসনের হাত থেকে ক্ষমতাকে জনগনের হাতে ন্যাস্ত করার তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণ করেছেন তিনি। রুশোর কাছে রাষ্ট্র হচ্ছে একটা সামাজিক চুক্তি, যে সামাজিক চুক্তির ভিত্তি হচ্ছে জনগণের সাধারণ সংকল্প।

আমাদের এমন একটা সংস্থা তৈরি করতে হবে যার মাধ্যমে আমরা আমাদের প্রত্যেকের অস্তিত্ব ওসম্পদকে রক্ষার জন্য সমগ্র সংস্থার শক্তিকে এমনভাবে বিন্যস্ত করতে পারি যাতে আমরা যখন সমগ্রর সাথে মিলিত হই তখন আমারা নিজেদের সম্মতিতে নিজেদের ইচ্ছারই মাত্র অনুগত হই এবং স্বাধীনতার ক্ষেত্রে আমাদের স্বাধীনতা এবং শক্তি পূর্বের মতোই অক্ষত থাকে। … সম্মতির ভিত্তিতে সমাজ সংস্থা যখনই বাস্তব রূপ লাভ করে তখনই এই সংস্থা প্রত্যেকটি সদস্যের জন্য সমগ্র সংস্থার নৈতিক এবং যৌথ শক্তি সহকারে প্রতিটি সদস্যের পাশে এসে বিত্রস্ত শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে উপস্থিত হয়। এবং এরই পরিণামে সমাজসংস্থার নবতর অস্তিত্ব এবং ইচ্ছার শক্তিপ্রাপ্ত হয়। নাগরিকদের সমবায়ে গঠিত এমন সমাজ সংস্থাকে প্রাচীনকালে একটা নগর বা নগররাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করা হতো। পুরাতন সেই অভিধার স্থলে আজ আমরা তাকে একটা রিপাবলিক বা রাজনৈতিক সংস্থা হিসেবে অভিহিত করে থাকি। এবং এই সংস্থাকে মানুষ তার নিস্ক্রিয় অবস্থায় ‘রাষ্ট্র’বলে অভিহিত করে; ক্রিয়াশীল অবস্থায় এই সংস্থাই সার্বভৌম জনশক্তিতে পরিণত হয়।

সুতরাং রিপাবলিক গঠনে, আগে জনগনের সাধারণ ইচ্ছাটা সংজ্ঞায়িত হওয়া দরকার। এই সংজ্ঞায়নের উপরই নির্ভর করে রাষ্ট্র বিশেষের ইচ্ছা থেকে কত দূরে বা সকলের ইচ্ছার কতটা কাছাকাছি। ১৯৭১ বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রিপাবলিক হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জনগনের এই সাধারণ ইচ্ছাটি সংজ্ঞায়িত হয় কেমন করে ?

আর্টওয়ার্ক: স্টপ সে্লেভারি
শিল্পী: কামিল জারজিক
সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একেবারে গোড়ার গলদটাই হল সাধারণ ইচ্ছাকে ব্যতিরেকে বিশেষের ইচ্ছায় রাজনৈতিক সংস্থা গঠন। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনপ্রতিনিধি হিসেবে ম্যানডেটপ্রাপ্তরাই এই  রাষ্ট্রের সাধারণ ইচ্ছাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। একটি গণবিপ্লবের পর সমাজে ত্রিয়াশীল জনসংগঠনগুলোকে বাদ দিয়েই রচিত হয়েছে জনগণের সামাজিক চুক্তির দলিল-বাংলাদেশের সংবিধান। এমনকি অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অংশীদারিত্বও পোক্ত হয়নি এই সংবিধান রচনায়। গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতা-জাতীয়তাবাদের লেবেল এঁটে কেমন করে একটি স্বৈরতন্ত্রী সংবিধান রচনা করা যায় তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ বাংলাদেশের সংবিধান।  কিন্তু এই সংকটের জড় কোথায় ?

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গতিপ্রকৃতি লিপিবদ্ধ করেছেন তৎকালীন বামপন্থী রাজনৈতিক চিন্তক রণেশ দাশ গুপ্ত। রনেশ দাশ গুপ্তের মতে যে বৈপ্লবিক ঘটনার ধারায় পুর্ব বাংলার মুক্তি সংগ্রাম সশস্ত্র মুক্তি যুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করেছে, তা পুর্ব বাংলার সর্বস্তরের নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও অংশগ্রহণের মাধ্যমেই ঘটেছে।

এই মুক্তি সংগ্রামে ক্রিয়াশীল সামাজিক বর্গগুলোকে চি‎হ্নিতকরেছেনরণেশ।

১. কৃষক
২. জাতীয় বুর্জোয়া বা উদীয়মান শিল্প উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী
৩. শ্রমিক
৪. মধ্যবিত্ত

একাত্তুরে স্বাধীন রিপালিক প্রতিষ্ঠায় এই প্রধান চারটি সামাজিক বর্গের রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক চেতনাকে বিসর্জন দিয়ে, অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্থলে হাজির হয় সমন্বয়বাদের কুইনিন-যার প্রধান ভারকেন্দ্র জাতীয়তাবাদ। এই জাতীয়তাবাদী কর্তৃত্ব আর  ইতিহাসচেতনা হেঁটেছে হাতে হাত ধরে। মূলত স্বাধীন দেশের শাসক-শোষকগোষ্ঠীকে আশ্রয় করে।

একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধোত্তর রিপাবলিক গঠনের গলদগুলো ধরা পড়ে খোদ ৭২’এর সংবিধানেই। ৭২’এর সংবিধানের রাষ্ট্রীয় মূল নীতি হিসেবে গনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদের তকমা থাকলেও সংবিধানের পরতে পরতে ছড়িয়ে ছিল স্বৈরতান্ত্রিক সব উপাদান। ৭২-এ একটি সত্যিকারের গণঅংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্থলে গড়ে তোলায় হয় স্বৈরতান্ত্রিক পার্টিস্টেট বা দলরাষ্ট্র, যার সমস্ত ক্ষমতা প্রায় ন্যাস্ত প্রধানমন্ত্রীর হাতে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়-

কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন তা হইলে সংসদে তাহার আসন শুন্য হইবে।

ব্যাখ্যা।-যদি কোন সংসদ সদস্য যে দল তাহাকে প্রার্থীরূপে মনোনীত করিয়াছেন, সেই দলের নির্দেশ অম্যান্য করিয়া-

ক. সংসদে উপস্থিত থাকিয়া ভোটদানে বিরত থাকেন; অথবা

খ. সংসদের কোন বৈঠকে অনুপস্থিত থাকেন, তাহলে তিনি উক্ত দলের বিপরীতে ভোটদানে করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে।

এমনিতেই রাজনৈতিক জনপ্রতিনিধিত্ব একটি স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা। বাহাত্তরের সংবিধান সেই ব্যবস্থাকে শুধু আত্তীকৃতই করেনি একই সঙ্গে তার সবচেয়ে স্বৈরতন্ত্রী রূপটিকে হাজির করেছে জনগণকে শাসনের জন্য। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ রাজনৈতিক জনপ্রতিনিধিত্বকে পুরোপুরি পর্যবসিত করেছে পার্টি প্রতিনিধিত্বে। একজন জনপ্রতিনিধি চাইলেও তার নিজ আসনের নির্বচকগণের মতমাফিক চলতে বাধ্য নন-তার সমস্ত বাধ্যবাধকতা পার্টির কাছে। এ ধরনের দলতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বৈরতন্ত্র আরও তীব্র হয় যখন প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার সর্বেসর্বা। সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী

৫৫। (১) প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি মন্ত্রসিভা থাকিবে। এবং প্রধানমন্ত্রী ও সময়ে সমযে তিনি যেরূপ স্থির করিবেন সেরূপ অন্যন্যমন্ত্রী লইয়া এই মন্ত্রিসভা গঠিত হইবে।

(২) প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বা তাহার কর্তৃত্বে এই সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রযুক্ত হইবে।

(৩) মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সংসদের কাছে দাযী থাকবেন।

তাহলে কি দাঁড়াল? প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার কাছে দায়বদ্ধ নন। এমনকি মন্ত্রিসভা পরিচালিত হবে তার হুকুমেই। কোন যৌথতার দাবি অবান্তর। তাহলে প্রধানমন্ত্রীর জবাবদিহিতা কার কাছে ? সংসদের কাছে। কিন্তু সংসদ সদস্যরাতো পার্টির সিদ্ধান্তের বাইরে গেলেই লক্ষণ রেখা পার করবেন! সুতরাং সাংবিধানিকভাবে এখানে প্রধানমন্ত্রী একনায়ক। তিনি যেমন করে ক্ষমতা চালাবেন তেমন করেই চলবে। একই সঙ্গে সাংবিধানিকভাবে জনবিচ্ছিন্ন এই রাজনৈতিক জনপ্রতিনিধিত্ব যদি সংসদে তার নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতির বাইরে বা বিরুদ্ধে কোন আইন পাশ করে বা কোন নীতি সমর্থন করে তবে তা অসাংবিধানিক হবে না। আদালতে চ্যালেঞ্জ করেও তাই কোন লাভ নেই। তাহলে একবারে মৌলিক প্রশ্নটা দাড়িয়ে যায় এই রিপাবলিকের সামাজিক চুক্তির ভিত্তি নিয়ে, যেখানে শাসনের কোন দায় জনগণের কাছে নেই – এমন চুক্তি হয় কেমন করে? হ্যাঁ, আর ঠিক এই জন্যই লাগে সাইনবোর্ড। সংবিধানে গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতা-জাতীয়তাবাদের তকমা। মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহনকারী সামাজিক বর্গের চেতনার বাইরে রাজনৈতিক দলগুলোর দর্শনের খিচুড়ি পাকিয়ে রচিত হয়েছে এই রিপাবলিকের ভিত্তি। কিন্তু রাজনৈতিক উচ্চকোটি তথা পলিটিক্যাল এলিটের ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করতেই দরকার ছিল এমন একটি স্বৈরতন্ত্রী ক্ষমতা। আর এমন একটি স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে নিরঙ্কুশ করতে দরকার ছিল ভিন্নমত ও অন্য রাজনৈতিক দলদের সাইজ করা। জনগণকে একটা ‘ইমাজিনড’দীক্ষিত রাজনৈতিক কমিউনিটি হিসেবে নির্মাণ করা। আর তাই হাজির হয়েছে ‘জাতীয় সংস্কৃতি’, ‘জাতীয় ঐতিহ্য’, ‘জাতীয় মহত্বের’বুলি। বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে একটি সর্বস্বৈরতান্ত্রিক জাতিরাষ্ট্রে।

সর্বস্বৈরতন্ত্র মানেই সর্বত্র কর্তৃত্বপরায়নতা। এই কর্তৃত্বপরায়নতা কায়েম হয় রাষ্ট্রের কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা যখন সমাজের অপরাপর প্রতিষ্ঠানে তার জাল বিস্তার করে। এজেন্সি নির্মাণ করে। এজেন্সি পাওয়ারের দাপট যখন নিরঙ্কুশ হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক দলই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার প্রধান এজেন্ট। তাই সব কিছুকেই রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অধীনে আনার চেষ্টা এখানে প্রবল। রাজনৈতিক দলমাত্রই তার প্রতিপক্ষ শ্রেণী-গোষ্ঠী-দল থাকে। ফলে তাকে প্রতিযোগিতা করতে হয়। এই প্রতিযোগিতায় জেতার জন্য ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার জন্য দরকার হয় সমাজের অপরাপর প্রতিষ্ঠানগুলোকে পার্টি-কর্তৃত্বের আওতায় আনার। চলতি কথায় যাকে বলে দলীয়করণ। বিশ্ববিদ্যলয়ও এ থেকে রেহাই পায় না। আবার ক্ষমতার মতাদর্শিক স্তম্ভ রচনার জন্যও প্রয়োজন হয় বিশ্ববিদ্যলয়কে ক্ষমতার অঙ্গে পরিণত করা। কথিত জাতীয় সংস্কৃতি, জাতীয় ঐতিহ্য, জাতীয় মহত্বের বুলি শেখানোর কারখানা।১০ ফলে বিশ্ববিদ্যালয় ধারণায় যতোই স্বধীনতা-স্বায়ত্তশাসন ইত্যাদি কথা থাকুক না কেনো, তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

১৯৭৩-এর অধ্যাদেশেও তখন ফাঁক-ফোকর খোঁজা হয়। আর তা দিয়েই বিশ্ববিদ্যলয়ের স্বায়ত্বশাসন পরিণত হয় আয়ত্বশাসনে। কিন্তু  কেমন করে? কৌশলটাইবা কী? এর জন্য আমাদের যেতে হবে ১৯৭৩-এর অধ্যাদেশে।

এ-অধ্যাদেশের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে:

১. আচার্য হিসেবে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ।

২. বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে উপাচার্যের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা এবং প্রশাসনিক কাঠামোতে কর্তৃত্ব-ক্রমতন্ত্র।

৩. সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় কাঠামোগতভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকা এবং বিশ্ববিদ্যালয়-প্রশাসনের জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি। এ বিষয়গুলোকে সূত্রবদ্ধ করলেই উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে।

বিশ্ববিদ্যালয়, ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব-ক্রমতন্ত্র

আধুনিক ক্ষমতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল তা হায়ারার্কিক। একেই আমরা বলছি কর্তৃত্ব-ক্রমতান্ত্রিক।১১ ক্ষমতার বিন্যাসটা সোপান বিশিষ্ট। থরে থরে সাজানো। শীর্ষ ক্ষমতা পাটাতনের কাছে ‘জবাবদিহি’করবে-এমনটাই এর সাধারণ নিয়ম। কেননা পাটাতনই সামষ্টিক ক্ষমতা, শীর্ষ ক্ষমতার ম্যান্ডেটদাতা। একই সঙ্গে সর্বচ্চ ফোরাম। কিন্তু বাস্তবে সামষ্টিক ক্ষমতার অংশীজনদের মধ্যে এঙ্করের কাজটি করে শীর্ষ ক্ষমতাই। স্বভবতই মিথস্ক্রিয়া না থাকায় অংশীজনদের মধ্যে আলাদা অঁটুট কোন সমঝোতা গড়ে ওঠে না।  কোন কোন ক্ষেত্রে শীর্ষ ক্ষমতাই চয়ন করে অংশীজনদের। ফলে পাটাতন আদতে বায়বীয় এবং স্বরহীন।

একই সঙ্গে আধুনিক ক্ষমতার আরেক ভিত্তি হল প্যান-অপটিসিজম। সোজা কথায় সর্বত্র নজরদারি, সবাই সবার নজরবন্দী। নজরদারির পারস্পারিক সমঝোতা। আমরা একটু দেখার চেষ্টা করি এই ক্ষমতা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমন করে খাটে।

উপাচার্য নিয়োগ:

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাটিউট বা নীতি নির্ধারণের সর্বোচ্চ ফোরাম সিনেট। সিনেটরদের  ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত তিন জনের প্যানেল থেকে একজনকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য রাষ্ট্রপতি। বলাবাহুল্য, রাষ্ট্রপতির এ নিয়োগও হয় প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা অনুসারে, তথাকথিত পরামর্শ নামে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মানেই দলীয় চূড়ান্ত ক্ষমতা। আর তাই উপাচার্য হতে গেলেও পার্টিজান হতে হবে। আর এ কারণেই দেখা যায়, রাষ্ট্র ক্ষমতায় পার্টি বদলালে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য বদলে যান।

আবার সিনেটের মোট সদস্য সংখ্যা ১০৫। এর মধ্যে ৩৫ জন শিক্ষক, ২৫ জন রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট, ৪০ জন বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ দ্বারা মনোনয়নে এবং ৫ জন শিক্ষার্থী যারা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের মাধ্যমে সিনেট সদস্য হিসেবে নির্বাচিত ও মনোনীত হন। গেল ২০-২৫ বছর কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নেই। সিনেটের ২০ জন সদস্যর উপর রাষ্ট্রর প্রত্যক্ষ এবং ২০ জনের উপর পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ থাকে। ফলে রাষ্ট্র এবং সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনে তীব্র প্রভাব বিস্তার করতে পারে,যা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্বশাসনের জন্য বড় হুমকি।

উপাচার্য়ের ক্ষমতা:

উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী। বিশ্ববিদ্যালয়ে কি দৃশ্যমান, কি অদৃশ্যমান, সকল ক্ষমতার মালিক তিনি। ৭৩ এর অধ্যাদেশের ধারা-১২তে উপাচার্যের ক্ষমতা বিবৃত করা হয়েছে।

  1. (1) The Vice-Chancellor shall be whole time principal executive and academic officer of the University and shall be Chairman of the Senate, the Syndicate and the Academic Council. He shall be entitled to be present and to speak at any meeting of any authority but, shall not be entitled to vote thereat unless he is a member of the authority concerned.(2) The Vice-Chancellor shall convene meetings of the Senate, the Syndicate and the Academic Council and shall preside over them.(3) Notwithstanding any provision contained in this Order or in any law for the time being in force, the Vice-Chancellor may, in any emergency which, in his opinion, requires immediate action, take such action as he deems necessary, and shall within seven days thereafter report his action to the officer or authority who or which, in the ordinary course, would have dealt with the matter.(4) The Vice-Chancellor shall, if he does not agree with the resolution of any authority of the University, have the power to withhold implementation of the resolution and refer it back to the authority concerned, with his opinion thereon, for reconsideration in its next regular meeting. If in the process of reconsideration the authority concerned does not agree with the Vice-Chancellor, the decision of the Syndicate shall be final.

    (5) The Vice-Chancellor shall give effect to the orders of the Syndicate regarding the appointment, dismissal and suspension of the officers and teachers of the University, and shall exercise general control over the members of the University, and shall be responsible for the discipline of the University in accordance with this Order, the Statutes and University Ordinances.

    (6) The Vice-Chancellor shall have the power to appoint, on a purely temporary basis, ordinarily for a period of not more than six months, officers (excepting the Pro-Vice-Chancellor and the Treasurer), teachers and administrative and subordinate staff and report such action to the Syndicate :

    [Provided that, if a temporary appointment cannot be regularised within the period for which it was made, such period may be extended, with the prior approval of the Syndicate, for a further period of three months on the expiry of which the temporary appointment shall stand terminated.]

    (7) The Vice-Chancellor may, with the approval of the Syndicate, delegate such of his powers and functions as he may consider necessary to such officer of the University as he may deem fit.

    (8) The Vice-Chancellor shall exercise such other powers as may be prescribed by the Statutes and the University Ordinances. ১২

উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক সর্বোচ্চ কর্মকর্তা। উপাচার্য একইসঙ্গে সিনেট-সিন্ডিকেট-একাডেমিক কাউন্সিল-পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কমিটির সভাপতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোন কর্তৃপক্ষের সভায় তিনি উপস্থিত থাকতে পারবেন, মতামত দিতে পারবেন। কোন কারণে সভা-সদস্যদের সিদ্ধান্তর সঙ্গে তার দ্বিমত হলে, তিনি তা ঐ কর্তৃপক্ষকে পুণর্বিবেচনা করতে বলতে পারবেন। তবে ঐ কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্তে অনড় থাকলে উপাচার্য তা সরাসরি সিন্ডিকেটের বিবেচনার জন্য প্রেরণ করবেন। সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা কাঠামো ক্রম-কর্তৃত্বতান্ত্রিক। সিন্ডিকেট সর্বোচ্চ নিবার্হী ক্ষমতার ফোরাম। ১৫/১৬ জন সদস্যর সমন্বয়ে এই ফোরামের গঠন:

  1. (1) The Syndicate shall be the executive body of the University and shall consist of the following persons, namely:-
    (a) the Vice-Chancellor;
    (b) the Pro-Vice-Chancellor or, if there is more than one, all the Pro-Vice-Chancellors;
    (c) two Principals of Colleges to be nominated by the Academic Council;
    (d) six teachers of the University to be elected by such teachers from among themselves;
    (e) two representatives of the Senate, one being a registered graduate and the other an educationist, to be elected by the Senate from among the members of the Senate;
    (f) three persons to be nominated by the Chancellor;
    (g) one Government official, not below the rank of a Secretary, to be nominated by the Government;
    (h) one distinguished citizen to be nominated by the Senate from outside its membership.১৩

৭৩ এর অধ্যাদেশ মাফিক ১৬ জন সদস্যর মধ্যে ৭ জনই উপাচার্যের ক্ষমতার সমান্তরালে অবস্থান করে। এতে করে সিদ্ধান্ত সবসমই উপাচার্যের পক্ষে যায়।

এই বিপুল ক্ষমতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্রেফ উপাচার্যকে ‘কট’করতে পালেই পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ‘কট’হয়ে যায়। এছাড়া একই সঙ্গে এত বিপুল ক্ষমতার অধিকারী বলে রাষ্ট্র যেকোন সিদ্ধান্ত উপাচার্যের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োগ করতে পারে।

আর্টওয়ার্ক: দ্য টিরান্ট
শিল্পী: ম্্যাত্তেো বার্তেলি
সূত্র কার্টুন মুভমেন্ট

উপাচার্যের ক্ষমতা এবং শিক্ষক রাজনীতি:

উপাচার্যের এই ক্ষমতার তীব্র প্রভাব পড়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী রাজনীতির উপরে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার প্রথম শর্তই হচ্ছে তার আনুগত্য। এই আনুগত্যর অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে উপাচার্যের স্বৈরক্ষমতাকে বিনাবাক্য ব্যয়ে মেনে নেয়া এবং তার পক্ষে থাকা। অনুরূপ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে যেকোন প্রশাসনিক পদ পাবার জন্য উপাচার্যের পছন্দই প্রায় চূড়ান্ত। এর জন্য শিক্ষকদের অবশ্যই উপাচার্যের আজ্ঞাবহ হতে হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের সাধারণ অধিকার আদায়ে জন্য শিক্ষকদের নিজস্ব ফোরাম শিক্ষক সমিতি থাকলেও তা ভিন্ন চেহারা নিয়েছে। এখানকার কর্ম-কর্তারা হচ্ছেন আগামী দিনে বিশ্ববিদ্যালয়-প্রশাসনের বিভিন্ন পদের ক্যান্ডিডেট। এর মাধ্যমে শিক্ষক সমিতির কর্মকর্তারা নিজেদের বিভিন্ন পদের প্রার্থী হিসেবে বিজ্ঞাপিত করেন। আবার শিক্ষক সমিতির পদ দখলে শিক্ষকরা ঐক্যের সূত্র হিসেবে সরাসরি রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে তৎপর হন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও পাকাপোক্ত হয়।

উপাচার্যের ক্ষমতা এবং শিক্ষর্থী রাজনীতি:

এতো গেলো শিক্ষক রাজনীতির কথা। কিন্তু ছাত্র রাজনীতি? বিশ্ববিদ্যালয় সবসময়ই একটি সামষ্টিক বিষয়। ফলে কাঠামোগতভাবেই স্বার্থের ঐক্য এবং একই সঙ্গে ভিন্নমতের চর্চা এখানে খুবই স্বাভাবিক বিষয়। ভিন্নমত চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতারই প্রতীক। কিন্তু এই স্বাধীনতাবোধ প্রসাসনিক স্বৈরতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করে বসতে পারে। ইতিহাস তার সাক্ষ্য দেয়। কিন্তু এই ভিন্নমতের চর্চা দমন হয় কিকরে? দাপুটে ক্ষমতার মাৎস্যন্যায় নীতির ধারক-বাহক ছাত্র সংগঠনগুলোর দ্বারা।

এই ছাত্র সংগঠনগুলো হল দখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, নিজেদের মধ্যে আধিপত্যের লড়াই ইত্যাদিতে ব্যস্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্র-কর্তৃত্ব কায়েমের ক্ষেত্রে তারা হচ্ছে প্রধান ক্ষত্রশক্তি। উপাচার্য যে-দলের, ক্যাম্পাসে  সে-দলের লেজুড় ছাত্র-সংগঠনেরই কর্তৃত্ব। কেননা, প্রশাসন হচ্ছে সে-ছাত্র সংগঠনের পাহারাদার। আর সে-ছাত্র সংগঠন হচ্ছে প্রশাসনিক স্বৈরতন্ত্রের লাঠি।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ২০-২৫ বছর ছাত্র-সংসদ নির্বাচন নেই। শিক্ষার্থী প্রতিনিধিত্ব অনুপস্থিত। সিদ্ধান্তগ্রহন প্রক্রিয়ায় তাদের ন্যূনতম কোন অংশগ্রহনও নেই। ফলে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত সবসময়ই একতরফা।

নয়া উদারবাদী শাসকতা: বিশ্ববিদ্যালয় ও অর্থায়ন

আধুনিক শাসন ব্যবস্থার যে বিকাশ ইউরোপে ১৬ শতকে দেখা গিয়েছিল, তাকে একেবারে ভিন্নভাবে এবং মধ্যযুগীয় ব্যবস্থা থেকে আলাদা হিসাবে পাঠ করেছেন ফরাসী দার্শনিক ফুকো। তাঁর মতে, ১৬ শতক থেকে শাসনের ধরন বদলে যেতে থাকে। এর আগ পর্যন্ত শাসন বলতে বোঝানো হত রাজা ও তাঁর ইচ্ছা বা উইল । বল প্রয়োগই এখানে ছিল শেষ কথা। আধুনিক গভর্নমেন্টালিটি সেই অর্থে আলাদা। ফুকোর প্রস্তাব মোতাবেক আধুনিক শাসকতা বা গভর্নমেন্টালিটি হচ্ছে,

…আচারের পরিচালনা- অর্থাৎ, চিন্তা ও কর্মের ঐ সকল হিসেবকরা ও নিয়মানুগ উপায়সমূহ, যা অন্যের আচরণকে কাঠামো দিতে, নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনা করতে সচেষ্ট হয়, এটা যেমন হতে পারে কারখানার শ্রমিক, জেলবন্দী মানুষ, মানসিক হাসপাতালের হেফাজতে থাকা মানুষ, শাসকের অধীন একটি ভূখন্ডের অধিবাসী, অথবা কোন একটি জনগোষ্ঠীর সদস্য (ফুকো উদ্ধৃত হয়েছেন ইনডা)

…the conduct of the conduct – that is, to all those more or less calculated and systematic ways of thinking and acting that aim to shape, regulate, or manage the comportment of others, whether these be workers in a factory, inmates in a prison, wards in a mental hospital, the inhabitants of a territory, or the members of a population১৪

ফুকোর মতে, কিভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ও মাত্রায় নিজকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, কিভাবে নিয়ন্ত্রিত হব, কিভাবে অন্যকে শাসন করতে হবে, কার দ্বারা শাসিত হলে মানুষ মেনে  নেবে বা কিভাবে সু-প্রশাসক হওয়া যায়- এই প্রশ্নগুলো ১৬ শতকের শাসকতার বৈশিষ্ট্যমন্ডিত জিজ্ঞাসা । আধুনিক গভর্নমেন্টালিটির ভেতরে থাকে মাল্টিপল নেটওয়ার্কস অব ইন্সটিটিউশনস, এক্টরস ইত্যাদি যা বিভিন্ন কৌশলের মধ্য দিয়ে সাবজেক্ট গঠন করে অর্থাৎ মানুষের আচারকে নির্ণয় করে। আধুনিক গভর্নমেন্টালিটি বলতে বোঝানো হচ্ছে মন-মানসিকতার শাসনকে (governing of mentalities)। এই তাত্ত্বিক আলোচনার মোদ্দা কথাটা হচ্ছে, আধুনিক কালে রাষ্ট্রের মাথা থেকেই কেবলমাত্র শাসনকার্য পরিচালিত হয়-এমন নয়। আধুনিক শাসন/ ক্ষমতা জালের মত সমাজে বিস্তৃত এবং এর সাথে নানা ধরনের জ্ঞান / ক্ষমতা ব্যবস্থার সম্পর্ক রয়েছে। একারনেই একটা স্বাধীন-সার্বভৌম (sovereign) কর্তাসত্তার ধারণা  ফুকোর তাত্ত্বিকতায় পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।১৫

অপরদিকে নিউ লিবারলিজম বা নয়া উদারবাদ খুব পরিচিত প্রপঞ্চ হলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক একটিভিস্ট মহলে একে নিয়ে আলোচনা খুব একটা দেখা যায় না। নয়া বিশ্ব ব্যবস্থা-যুদ্ধ অর্থনীতি-বিশ্বব্যাংক-আইমএমফ-ট্রান্সন্যাশনাল কর্পোরেশনের পরস্পর সম্পর্ক এবং ক্ষমতার প্রবণতা বুঝতে নিউ লিবারালিজমের জিনিওলজি বোঝা জরুরি।

নয়া উদারবাদ এমন এক ব্যবস্থা যার মৌলিক ভিত্তিগুলো একই সঙ্গে নতুন এবং ধ্রুপদী উদারনৈতিক চিন্তা প্রসূত। চমস্কি Washington consensus কে এর ভিত্তি হিসেবে মনে করেন। Washington consensus মূলত যুক্তরাষ্ট্র প্রণীত বাজার তাড়িত কতকগুলো  মৌলিক নীতি যা আন্তার্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থা,বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ দ্বারা কার্যকর। সমাজের তলানিতে থাকা মানুষ আর পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে ‘টেনে তুলতেই’নাকি এই নীতি। আদতে যুক্তরাষ্ট্রের গুটিকতক এলিট-বিজনেস টাইকুনের স্বার্থে পরিচালিত এক বাজার লালসা। চমস্কির মতে Washington consensusএর মূল কথা হল:

The basic rules, in brief, are: liberalize trade and finance, let markets set price (“get prices right”), and inflation (“macroeconomic stability”), privatize. The government should “get out of the way”—hence the population too, insofar as the government is democratic, though the conclusion remains implicit. The decisions of those who impose the “consensus” naturally have a major impact on global order. Some analysts take a much stronger position. The international business press has referred to these institutions as the core of a “de facto world government” of a “new imperial age.” ১৬

নয়া উদারবাদ ক্রমাগত সামাজিক সুরক্ষা খাতকে সংকুচিত করে ঘটায় পণ্যায়ন। আবার একই সঙ্গে উন্নয়নের গালভরা বুলিতে নিশ্চিত করে পুঁজি ও পণ্যের অবারিত প্রবাহ।  জাতিসঙ্ঘ-বিশ্বব্যাংক-আইমএফ- এডিবি-আইএনজিও এমন নানাবিধ প্রতিষ্ঠান মিলে ঠিক করে এর ব্যবস্থাপত্র, দাঁড়ায় শাসনের নতুন বয়ান, নতুন প্রত্যয়, নতুন জ্ঞানতত্ত্ব। একেই আমি বলছি নয়া উদারবাদী শাসকতা।

আমাদের দেশে মূলত গেল শতকের সত্তর এবং আশির দশকেই ‘সবুজ বিপ্লব’এবং  ‘দারিদ্র দূরিকরণে ক্ষুদ্রঋণ’‘সাবলম্বি হন’এই সব গাল ভরা বুলি আমরা শুনেছি। দেখেছি পুঁজি-পণ্যের প্রবাহ ঠিক রাখতে অবকাঠামো নির্মাণের বাগাড়ম্বর এবং শাসকতার ‘সাফল্য’! আবার ৯০ পরবর্তী সময়ে দেখেছি কেমন করে একেরপর এক রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পুঁজি আর সস্তা শ্রমের ঐক্যে ছাপা-মার যুদ্ধের স্টাইলে গজিয়ে উঠেছে ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠান। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ: একদিকে পাট শিল্প ধ্বংসকরণ; অন্যদিকে কর্মপরিবেশহীন, ন্যুনতম মজুরিহীন গার্মেন্টস শিল্প। ধ্বংস হয়েছে আমাদের কৃষি ব্যবস্থাও। কৃষি মানেই এখন হাইব্রিড-কর্পোরেট বীজ-কীটনাশক-ক্ষুদ্রঋণ-সিনজেন্টা। ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে খোদ ‘পাবলিক’ ধারণাটাই। জেঁকে বসছে মুক্ত বাজার লালসা। আর এই সমস্ত কিছুর একটাই মেকানিজম, ‘দাতা-সংস্থার’ব্যবস্থাপত্র। স্বভাবতই এ থেকে মুক্ত নয় আমাদের শিক্ষাখাতও, বিশেষত উচ্চ শিক্ষাখাত।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ২০০৬-২৬ সাল পর্যন্ত যে উচ্চশিক্ষার কৌশলপত্র প্রণয়ণ করেছে, তারই বাস্তবায়নের চেষ্টা হচ্ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। চার স্তরবিশিষ্ট এই কৌশলপত্রের প্রথম পর্যায় শুরু হয়েছে ২০০৬-০৭ সালে। স্বল্পমেয়াদি পর্যায় ছিল ২০০৮-১৩। মধ্যমেয়াদি পর্ব শুরু হয়েছে ২০১৪-১৯ এবং দীর্ঘমেয়াদি পর্ব নির্ধারিত ২০২০-২৬। প্রতিটি স্তরে ২৫ শতাংশ হারে শিক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে এবং ২০২৬ নাগাদ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অন্তত ৫০ শতাংশ ব্যয় অভ্যন্তরীণ খাত থেকে জোগাড় করার কথা বলা হয়েছে। গেল বছর থেকে শুরু হয়েছে মধ্যমেয়াদি পর্ব। ফলে তোড়জোড়টা বেশ চোখে পড়ছে। অভ্যন্তরীণ ব্যয় নির্বাহের প্রচেষ্টা হিসেবেই ছাত্র ভর্তি ফি বাড়ানো বা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সন্ধ্যাকালীন কোর্স চালু করার যৌক্তিকতা দিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। ১৭

২০১৪ সারের ফ্রেব্রুয়ারি মাসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বাণিজ্যিক সান্ধকালীন কোর্স তথা কৌশলপত্র বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে যখন তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে তখন আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশের উপরে গুলি চালাতে দ্বিধা করেনি কর্তৃপক্ষ। স্বাধীন সত্যানুসন্ধানে প্রমান মেলে সিস্টেমেটিক ভায়োলেন্সের। ডেমোসাইড-ফেমিসাইডের মত অপরাধ সংগঠিত হয়। এতটাই বেপোরোয়া ছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ! ১৮

উচ্চ শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প, প্রায়োগিক গবেষণাগার, শিল্পবন্ধব গবেষণা ইত্যাদি নানা প্রকল্পের নামে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বব্যাংক ক্রিয়াশীল। বিস্তৃত হয়েছে নয়া উদারবাদী শাসকতার জাল। খুব অবাক হব না, যদি একদিন আদমজীর মতই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দিতে বলা হয়।

অার্টওয়ার্ক: ফ্রিডম ইন এক্সাইল
শিল্পী: কিয়ানোস রামিজানি
সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিপরায়ন রূপকল্প১৯ : স্বাধীনতা-সংহতি-সৃজনশীলতা

আমরা যদি সত্যিকারের স্বাধীন সংহতিপরায়ন এবং সৃজনশীল বিশ্ববিদ্যালয় বিনির্মাণ করতে চাই তবে প্রথমেই আমাদের প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় নয়া উদারবাদী এই শাসকতাকে মোকাবেলা করা। আর এর জন্য প্রয়োজন জ্ঞানের পাল্টা বয়ান-পাল্টা ডিসকোর্স-পাল্টা যুক্তিপ্রণালী। আর এসব তখনি সম্ভব যখন নিশ্চিত হবে ন্যূনতম বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কর্তৃত্ব-ক্রমতান্ত্রিক ক্ষমতা-বিন্যাসের পরিবর্তন সাধিত না হলে বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে না।

কাঠামোগত পরিবর্তন:

কর্তৃত্ব-ক্রমতন্ত্র নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ভিত্তি হবে সরাসর গণতন্ত্র (Direct Democracy)। ২০ এর মূল কথা হল ক্ষমতায় গণঅংশিদারিত্ব। ব্লাংক চেকপ্রাপ্ত প্রতিনিধিত্ব নয়, বরং কতগুলো মৌলিক নীতির ভিত্তিতে বার্তাবাহক/ডেলিগেট মারফত পরিচালনা। সমন্বয়ের জন্য স্বল্পমেয়াদী পদায়ন।

১.   বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতার বিন্যাসে বিভাগগুলো হবে এক একটা স্বতন্ত্র ইউনিট। এটিই হবে সিদ্ধান্ত গ্রহনের প্রথম এবং মৌলিক ফোরাম। বিভাগের শিক্ষক, এবং বর্ষপ্রতি প্রতি ২৫ জনে ১ জন করে শিক্ষার্থী দূত  সমন্বয়ে ফোরাম গঠিত হবে। প্রশ্নপত্র ছাড়া বিভাগের সকল ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহন প্রক্রিয়ায় তারা যুক্ত হবেন। একই ভাবে শিক্ষক সমিতি, এলামনাই এসোসিয়েশন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও এমন  মৌলিক ফোরাম থাকতে পারে।

২.   আচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা-কর্মচারিদের সরাসরি ভোটে ৪ বছরের জন্য নির্বাচিত হবেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে জেষ্ঠ ১৫ জন শিক্ষক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। আচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বময় সম্মানের অধিকারী হবেন। তিনি সিন্ডিকেটে সভাপতিত্ব করবেন। কিন্তু তার কোন নির্বাহী ক্ষমতা থাকবে না।

৩.   বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ জন উপাচার্য থাকবেন। উপাচার্য-একাডেমি, উপাচার্য-অর্থ, উপাচার্য-প্রশাসন, উপাচার্য-গবেষণা। উপাচার্যগণ শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী দূতদের ভোটে নির্বাচিত হবেন। উপাচার্য সিন্ডিকেট এবং সিনেটের ম্যান্ডেটের বাইরে ক্ষমতাশুন্য থাকবেন।

৪.   সিনেট হবে সবগুলো বেসিক ফোরামের ফেডারেটিভ বডি এবং সমন্বয়সভা। আর সিন্ডিকেট হবে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কার্যকরি সভা। আর একাডেমিক কাউন্সিল গঠিত হবে একাডেমিক এক্সিলেন্সির ভিত্তিতে।

ক্ষমতার বিন্যাসটা হবে নিম্নকোটি থেকে উচ্চ কোটির দিকে। যত উপরে যাওয়া যাবে ততই ক্ষমতা কমতে থাকবে। শুধুমাত্র মৌলিক ফোরাম বিভাগে যেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে না, অন্য বিভাগ বা ফোরামের সঙ্গে সহায়তা-সমন্বয় প্রয়যোজন হবে, সেই সিদ্ধান্তগুলোই ফেডারেটিভ বডি সিনেটে নেয়া হবে।

অর্থায়ন:

বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজস্ব বাজেট দেবে রাষ্ট্র। আর উন্নয়ন বাজেট বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই যোগান দিতে পারবে। যদি-

১.   বিশ্ববিদ্যালয়  জ্ঞান-উৎপাদনমুখী হয় এবং সেই জ্ঞানের উপযোগিতা থাকে।

২.   জ্ঞান-প্রযুক্তি-নানা গবেষণা লব্ধ উদ্ভাবনীর পেটেন্ট এবং দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে তার চুক্তি সম্পাদন ।

৩.   ব্যক্তিগত নয় বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করা। বাণিজ্য অনুষদ বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সলিউশন ছাড়াও অডিট-একাউন্স ইত্যাদিতে পরামর্শক হিসেবে আয় করতে পারে। আর সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ সামাজিক গবেষণা-জরিপ- ইত্যাদি কাজে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে পারে।

রাষ্ট্রীয় পরিসরে বিশ্ববিদ্যালয়:

রাষ্ট্রীয় পরিসরে উচ্চশিক্ষা বিষয়ে পরিকল্পনা ও আলোচনার জন্য শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি কমিশন গঠন করা যেতে পারে। তবে কমিশন কোনভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।

উপসংহার

নয়া উদারবাদী শাসকতার দাপটে জ্ঞানের সঙ্গে জীবন-সমাজ-সংস্কৃতির দুরত্ব বাড়ছে। ফলে ক্রমাগত জ্ঞান পরিণত হচ্ছে টেকনোক্রাটিক পারফরমেন্সের বিষয়ে। এর খপ্পর থেকে বেরুতে হলে স্ব-প্রশ্ন জীবন পরীক্ষণের দর্শনের বিকল্প নেই। আর এ জন্যই অকুপাই  আন্দোলন প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। আমাদের সংগঠিত করতে হবে এমন এক আন্দোলন যার প্রতিরোধ হবে সর্বব্যাপী, গঠন হবে আনুভূমিক, ভাষা হবে নতুন।

 

তথ্যপঞ্জী:

১.   স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বক্তৃতামালা

২.   আজাদ, হুমাযূন (১৯৯৬) রাষ্ট্র এ বিশ্ববিদ্যালয়, আধার আধেয়; আগামী প্রকাশনী ঢাকা।

৩.   ইসলাম, শহীদুল (২০০৮) গণতন্ত্রেও সম্প্রসারণ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বয়ত্বশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বায়ত্তশাসন; শিক্ষাবার্তা প্রকাশন, ঢাকা।

৪.      WORLD DECLARATION ON HIGHER EDUCATION FOR THE TWENTY-FIRST CENTURY: VISION AND ACTION ( 1990) Unesco http://www.unesco.org/education/educprog/wche/declaration_eng.htm

৫.   করিম, সরদার ফজলুল (২০০০ ) রুশোর সোশ্যাল কনট্রাক্ট,  ম্ওালা ব্রাদার্স

৬.   দাশগুপ্ত, রণেশ (১৯৭১) মুক্তি সংগ্রামের গতিপ্রকৃতি, বেহাত বিপ্লব: ১৯৭১, সম্পা: সলিমুল্লাহ খান; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা

৭.   গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান

৮.   জাতিরাষ্ট্রের ভাঁওতা হল জনগনের নামে উচ্চকোটির স্বার্থবাহী বিশেষের রাজনৈতিক ক্ষমতা সংস্থাপন। জনগনের ইচ্ছার নামে বিশেষের ইচ্ছা ও আজ্ঞা বাস্তবায়ন তার মূলমন্ত্র। কিন্তু এই ইচ্ছা ও আজ্ঞা উৎপাদন করতে হয়। রকার এর কারণ ব্যাখ্যা করেছেন খুব চমৎকারভাবে :The will of the few may become the will of all – for only thus can it develop its full effectiveness – every form of intellectual and moral drill must be employed to anchor it in the (modern) religious consciousness of the masses and make it a matter of faith.আসলে রাজনৈতিক ক্ষমতা সবসময়ই বিশেষেরÑরাজনৈতিক রাষ্ট্রও তাই। রাজনৈতিক জনপ্রতিনিধিত্বের নামে যতই জনগনের শাসনের কথা বলা হোক না কেন, প্রকৃতপক্ষে তা জনগনকেই শাসন। জনগনের উপর কর্তৃত্ব।

৯.   গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান

১০.  মাহমুদ, আরিফ রেজা ( ২০১৫) পাওয়ার: গভর্নমেন্টালিটি-হায়ারার্কি-প্যান আপটিক; প্রকাশিতব্য

১১.  মাহমুদ, আরিফ রেজা (২০১৪) নয়া জাতীয়তাবাদী রেটোরিক: জাতীয় সংস্কৃতি, জাতীয় ঐতিহ্য, জাতীয় মহত্ব; ই-বুকলেট; গেরিলা,  ঢাকা

১২.      The Rajshahi University Act (1973)
http://bdlaws.minlaw.gov.bd/print_sections_all.php?id=438

১৩. The Rajshahi University Act (1973)  cÖv¸³

১৪. Inda, J. X. ed. (2005). Anthropologies of Modernity: Foucault, governmentality, and life. Cambridge: Blackwell Publishing

১৫. Ong, A. (1999). Flexible Citizenship: The Cultural Logics of Transnationality. Duke University  Press : Durham and London.

১৬. Chomosky, Noam(1999 ) Profit-Over People/ Neoliberalism and Global Order; Seven Stories Press, Newyork.

১৭.  ইউজিসির কৌশলপত্র (২০০৬)

১৮.   ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং প্রতিবেদন (২০১৪) সম্পা: আরিফ রেজা মাহমুদ ও প্রমুখ; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যলয় সাবেক শিক্ষার্থী মঞ্চ; ঢাকা             https://2ndfebruary.wordpress.com/

১৯.   রূপকল্প প্রত্যয়টি বিভিন্ন এনজিওর বহুল ব্যবহারে নয়া উদারবাদী শাসকতার রেটোরিক মলে মনে হলেও আদতে এর জন্ম ইউরোপের শ্রমিক আন্দোলনে। মতাদর্শের বিকল্প হিসেবে। এনার্কিস্ট মুভমেন্টে এই শব্দটির চল এখনো গুরুত্বসহকারেই আছে।

২০.Kelvin Doyle ( 2001) Perliamnet or Demecracy ?

    http://surf.to/anarchism

 

অারিফ রেজা মাহমুদ

অারিফ রেজা মাহমুদ

লেখক