অরাজ
শিল্পী: সিদ্ধার্থ সাজিরাও
প্রচ্ছদ » শোয়েব ড্যানিয়েল।। ভারত নয়, সংস্কৃত’র আদিসূত্র সিরিয়া

শোয়েব ড্যানিয়েল।। ভারত নয়, সংস্কৃত’র আদিসূত্র সিরিয়া

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

সম্পাদকীয় নোট: বিজেপি’র আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদী জাতিবাদের অন্যতম ভিত্তি সংস্কৃত ভাষার নেটিভিজম। ভারতের মাটিতেই এই ভাষার উৎসারণ- এমন প্রকল্প আর্য-আগামন তত্ত্বকে অস্বীকার করে এবং জাতিগত শুচিতাকে হিন্দুত্ববাদী সর্বভারতীয়তার ভিত্তি হিসেবে গণ্য করে। পার্সি-আরব-তুর্কি ইত্যাদিকেই কেবল  ‘বহিরাগত’ বর্গীকরণ করে। এই সাম্প্রদায়িক প্রকল্পের একটি প্রতিকল্পই খুঁজেছেন ভারতীয় সাংবাদিক ও গবেষক শোয়েব ড্যানিয়েল। এমন আরও হয়তো অনেক প্রতিকল্পই আছে। ২০১৫ সালে প্রবন্ধটি স্ক্রলে প্রকাশিত হয়। লেখাটি সময়োপযোগি করে অনুবাদ করেছেন অদিতি ফাল্গুনী।

শিল্পী: সিদ্ধার্থ সাজিরাও

মূল প্রবন্ধ

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর দেশের প্রাচীন সভ্যতার নানা উপাদানের পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে ইয়োগার পর সংস্কৃত ভাষার মর্যাদা পুন:প্রতিষ্ঠায় ব্রতী। ২০১৫ সালে থাইল্যান্ডে ‘১৬তম বিশ্ব সংস্কৃত সম্মেলন’-এ ভারত সরকার প্রবল উদ্দীপনার সাথে অংশ নেয়। ভারত থেকে প্রায় ২৫০ সংস্কৃত জানা পণ্ডিত এই সম্মেলনে অংশ নেন। ভারত সরকার সম্মেলন আয়োজনের খরচ আংশিক বহন করে। ভারতের তদানীন্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এই সম্মেলনের উদ্বোধন করেন এবং তদানীন্তন মানব সম্পদ মন্ত্রী স্মৃতি ইরানী ২০১৫-এর ২রা জুলাই সম্মেলনের সমাপনী ঘোষণা করেন। সুষমা স্বরাজ সেসময় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংস্কৃত ভাষা বিষয়ক সচিবের পদও ঘোষণা করেন। শুনতে যতই অস্বাভাবিক শোনাক। যদিও সংস্কৃতের মত এক প্রাচীন ভাষা যা আজ হয়ত কেউই আর পড়ে না, বলে না বা লেখে না, সেই ভাষা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজে কতটা সহায়ক হবে সেটা বলা কঠিন।

ভারতের অভ্যন্তরে সংস্কৃত ভাষার ব্যবহার পরিষ্কার অর্থবোধক: ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের সঙ্কেত এই ভাষা। সংস্কৃত ভাষা হিন্দু ধর্মের ধর্মীয় আচার-আচরণ ও কৃত্যাদি সমাপনের ভাষা, এত পবিত্র যে নিচু জাতদের (যারা আধুনিক হিন্দু জনতার ৭৫ শতাংশ) এই ভাষার আবৃত্তি শোনারও অধিকার ছিল না। ভারত রাষ্ট্রের নাগরিকদের ভাষাগত দক্ষতা অর্জনে সংস্কৃত এমন কোন কাজে আসবে না। যেখানে রাষ্ট্র সব নাগরিককে তাদের জীবন্ত মাতৃভাষাতেই লিখতে-পড়তে দেবার সুযোগ দেয় না, সেখানে প্রাচীন এক ভাষার অনুশীলন বা উদযাপনে কি যাবে আসবে? তবে এতে বিজেপির রাজনৈতিক লক্ষ্য বা প্রাচীন ঐতিহ্যভিত্তিক পুনরুজ্জীবনবাদী এক ধরনের আগ্রাসী জাতীয়তাবাদের চর্চা সহজতর হয়।

দূর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও বাস্তবতা প্রায়ই অতি সরলীকৃত জাতীয়তাবাদী পুরাণের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। বিজেপির হিন্দু-জাতীয়তাবাদী রাজনীতি সংস্কৃত ভাষা যেখানে কিনা এক চিহ্নায়ক, সেখানে যদি এমনটা শুনতে পান যে ভাষা-তাত্ত্বিক বা পুরাতাত্ত্বিক নানা উপাদানের প্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্তে আসা যাচ্ছে যে পৃথিবীতে প্রথম যারা বা যে জনগোষ্ঠি সংস্কৃত ভাষা ব্যবহার করেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে তারা হিন্দু বা এমনকি ভারতীয়ও নয়- তারা ছিল সিরিয়ার অধিবাসী বা সিরীয়।

সংস্কৃত ভাষী প্রাচীন সিরীয়রা
ঋগ্বেদে সংস্কৃত ভাষার যে আদিতম নির্দশন পাওয়া যায় সেই ঋগ্বেদীয় সংস্কৃতের প্রথম শিলালিপি ভারতে নয়- পাওয়া গেছে আজকের সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে। খৃষ্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ১৩৫০ অব্দে মিতান্নী নামে এক রাজবংশ ইউফ্রেটিস-টাইগ্রিস নদীদ্বয়ের উর্দ্ধ অববাহিকায় রাজত্ব করতেন। ইউফ্রেটিস-টাইগ্রিস নদীদ্বয়ের উর্দ্ধ অববাহিকার সংলগ্ন ভূ-খণ্ডই আজকের সিরিয়া, ইরাক ও তুরষ্কের ভূখণ্ড। মিতান্নীরা হুররিয়ান নামে যে ভাষায় কথা বলতেন, তার সাথে সংস্কৃতের সম্পর্ক নেই। তবে, প্রত্যেক মিতান্নী নৃপতিরই একটি সংস্কৃত নাম থাকত। শুধু রাজা নয়, মিতান্নী অভিজাতদেরও একটি সংস্কৃত নাম থাকত। এই নামগুলোর ভেতরে ছিল ‘পুরুষ’, ‘তুসরত্ত (যার আছে আক্রমণকারী রথ),’ ‘সুবরদাতা (স্বর্গ থেকে পাওয়া সৌভাগ্য),’ ‘ইন্দ্রতা (ইন্দ্র কর্তৃক সাহায্যপ্রাপ্ত)’ এবং ‘সুবন্ধু’ যা আজকের ভারতেও একটি সাধারণ নাম হিসেবে প্রচলিত।

আর্ট্ওয়ার্ক: ট্রি অব লাইফ
শিল্পী: দীপা হেক্রে
সূত্র: পিনটারেস্ট

এই মিতান্নীদের সংস্কৃতি ছিল বৈদিক আর্যদের মতই, ছিল রথ ও যুদ্ধভিত্তিক সভ্যতা। একটি মিতান্নী অশ্ব-প্রশিক্ষণ ম্যানুয়ালে বেশ কিছু সংস্কৃত শব্দ পাওয়া যাচ্ছে: ঐক (এক), তেরা (তিন), সত্ত (সাত) এবং আশুয়া (অশ্ব বা ঘোড়া)। এছাড়াও, মিতান্নী অভিজাত সামরিক রথবাহী যোদ্ধা বা ‘মারিয়ান্না’দের দ্বারা গঠিত হত। উল্লেখ্য, সংস্কৃত ভাষায় ‘মারিয়া’ অর্থ ‘যুবক’।

মিতান্নীরা যে দেবতাদের উপাসনা করতেন তাদের ভেতর নিজস্ব বা স্থানীয় কিছু দেব-দেবী ছাড়াও ঋগ্বেদে একাধিক দেবতার নাম পাওয়া যাচ্ছে। যেমন, খৃষ্টপূর্ব ১৩৮০ অব্দে এক প্রতিদ্বন্দ্বী রাজার সাথে চুক্তি সম্পাদনের সময় ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র ও নাসত্য (অশ্বিনী ভ্রাতাদ্বয়) মিতান্নীদের পক্ষে দৈব স্বাক্ষী হচ্ছেন। আজকের ভারতে হিন্দুরা এই দেবতাদের প্রায় বিস্মৃত হলেও ঋগ্বেদে তাঁরাই ছিলেন প্রধান দেবতা।

এই বিষয়টা সত্যিই চমকে দেবার মত। তবে ডেভিড অ্যান্থনি তাঁর বই অশ্ব, চক্র এবং ভাষা –য় উল্লেখ করেছেন যে এই পুরাতাত্ত্বিক উদাহরণ এটাই বোঝাচ্ছে যে উত্তর-পশ্চিম ভারতে ঋগ্বেদীয় সংস্কৃত ভাষার সঙ্কলণ হবার আগে শুধু যে এই ভাষাই বহির্বিশ্বে প্রচলিত ছিল তা’ নয় বরং ‘ ঋগ্বেদে সঙ্কলিত কেন্দ্রীয় দেব-দেবী এবং নৈতিক বিশ্বাসও সমপরিমাণ অতীতকাল থেকেই ভারতীয় ভূখন্ডের বাইরেও প্রচলিত ছিল।’

সংস্কৃত ভাষা ভারতের আগে সিরিয়া কিভাবে পৌঁছেছে?
এই অভাবনীয় ঘটনার কি ব্যখ্যা? পিএন ওক ও তাঁর চড়া মাত্রার হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসই তবে সত্য? গোটা পৃথিবীই একসময় হিন্দু ছিল? মক্কার কাবা ছিল শিবলিঙ্গ? এমন হাস্যকর সব গল্প? দূর্ভাগ্যজনকভাবে, পেছনের ইতিহাস অনেক বেশি গদ্যময় ও বেরসিক। সংস্কৃত ভাষা যে ভাষা-গোত্রর সন্তান সেই প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোত্রর আর এক সন্তান হচ্ছে প্রোটো-ইন্দো-ইরানীয়। প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাই ইরান ও উত্তর ভারতের অধিকাংশ ভাষার প্রপিতামহ। জেপি ম্যালোরি ডিকিউ অ্যাডামস সম্পাদিত এনসাইক্লোপেডিয়া অফ ইন্দো-ইউরোপীয়ান কালচার দেখাচ্ছে যে প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার প্রাচীনতম ব্যবহারকারীরা উরাল হ্রদের দক্ষিণে ও কাজাখস্থানে ছিলেন। স্তেপ তৃণভূমির এই সন্তানেরা খৃষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দে প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় কথা বলতেন যাদের ‘আন্দ্রোনভো’ সংস্কৃতির প্রতিনিধিও মনে করা হয়। মধ্য এশিয়ার এই জন্মভূমিতে একটি গোষ্ঠির মানুষের উদ্ভব হলো যারা প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় বলা ছেড়ে সংস্কৃতের আদি রূপে কথা বলা শুরু করলেন। এদেরই একটি অংশ পশ্চিমে সিরিয়া ও আর একটি অংশ পূর্বে ভারতের পাঞ্জাবের দিকে যাত্রা শুরু করলেন।

শিল্পী: সিদ্ধার্থ সাজিরাও

ডেভিড অ্যান্থনির মতে পশ্চিমে সিরিয়ার পথে যারা যাত্রা করলেন তারা সম্ভবত: সিরিয়ার হুররিয়ান রাজাদের দ্বারা ভাড়াটে রথ-যোদ্ধা হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। এই রথ-যোদ্ধারা যে ভাষায় কথা বলতেন বা যেসব মন্ত্র আবৃত্তি করতেন সেটাই পরবর্তী সময়ে পূর্বে পাঞ্জাবের পথে যাত্রা করা তাদের সহযোদ্ধারা আবৃত্তি করবেন।

এই ঋগ্বেদীয় সংস্কৃতভাষীরাই একটা সময় সিরিয়ায় তাদের নিয়োগদাতা রাজবংশকে সরিয়ে মিতান্নী রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করে। রাজত্ব প্রতিষ্ঠার কিছুদিনের ভেতরেই মিতান্নীরা তাদের নিজ সংস্কৃতি হারিয়ে স্থানীয় হুররিয়ান ভাষা ও ধর্ম গ্রহণ করে। তবে, রাজকীয় নাম, রথবিদ্যা সংক্রান্ত কিছু প্রযুক্তিগত শব্দ এবং ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র ও নাসত্য দেবতারা তাদের শব্দ ভান্ডারে থেকে যান।

অন্যদিকে পূর্বে যারা গেলেন তারাই পরে ঋগ্বেদের রচনা ও সঙ্কলণ করবেন। নিজ সংস্কৃতি সংরক্ষণের সৌভাগ্য তাদেরই হয়েছিল। এই ভারত উপমহাদেশেই তাদের ভাষা ও ধর্ম এমন শেকড় গাড়ল যে  ৩৫০০ বছর পরও আধুনিক ভারতীয়রা সেই বহু আগের স্তেপ তৃণভূমি থেকে ছড়িয়ে পড়া পশুচারী যাযাবরদের ভাষাকে উদযাপন করতে ব্যাঙ্কক যান!

সংস্কৃতের সমৃদ্ধ ইতিহাসের হিন্দুত্বকরণ
দূর্ভাগ্যজনকভাবে যদিও সেই প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় জনতার ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতিকে উদযাপন করা হচ্ছে, তবে তাদের স্মৃতিকে আজকের ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বেদিমূলে মুছে ফেলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে সংস্কৃত ভাষা ভারতের ভূমি থেকেই উঃসারিত। প্রবল হিন্দুত্ববাদী আদর্শ ভারতীয় ভৌগোলিক অবস্থানকে জাতীয়তাবাদের শর্ত হিসেবে দেখতে চায়। অথচ, ভারতে প্রবেশের আগেই [বা ভারত-পূর্ব সময়ে] হিন্দুধর্মের ভিত্তি ভাষা সংস্কৃতর অস্তিত্ব ছিল- এই তথ্য হিন্দুত্ববাদের পায়ের নিচ থেকে গালিচা বা ছিন্ন বস্ত্র যাই বলুন তা’ সরিয়ে নেয়।

আর্ট্ওয়ার্ক: হেড
শিল্পী: মিশেল বাসকুয়াত
সূত্র: উইকি আর্ট

খুব কৌতুককরভাবেই ভারতের যমজ রাষ্ট্র পাকিস্তান পুরো উল্টো পথে হাঁটছে। তারা আরবে তাদের পিতৃ পরিচয় খুঁজছে ও উপমহাদেশে নিজ শেকড় ভুলতে চাইছে। ভারত বা পাকিস্তান, আরবীয় বা সংস্কৃত ভাষা নির্ভর যে কাল্পনিক, বিশুদ্ধ ও কুমারী দেশভাবনা গড়তে চাইছে যেখানে কোন ‘ভিন্ন’ প্রভাব নেই তা’ অলীকই। বাস্তব জগত মিথের মতো নয়, খুবই আলাদা বিষয়। পাকরা আরব নয় এবং এনসাইক্লোপেডিয়া অফ ইন্দো-ইউরোপীয়ান কালচার খুব তীব্রভাবেই জানাচ্ছে যে ‘এই তত্ত্ব (সংস্কৃত এবং এর পূর্বসূরী প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয়ান পূর্বসুরীরা ভারতের আদিবাসী) যা ইন্দো-ইউরোপীয় সংস্কৃতি বিষয়ে কিছু আদিতম অনুমানকে পুনরুজ্জীবিত করে- তার স্বপক্ষে কোন ভাষা-তাত্ত্বিক বা পুরাতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই।’
মোদ্দা কথায়, সংস্কৃত ভাষা ভারতে বহির্পৃথিবী থেকেই এসেছে।

অদিতি ফাল্গুনী

অদিতি ফাল্গুনী

অদিতি ফাল্গুনী

অদিতি ফাল্গুনী